যেভাবে পেলাম আজকের শহীদ মিনার

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২০ এএম

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যারা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করে শহীদ হন তাদের স্মরণে ঢাকা মেডিকেলের পাশে তৈরি হয় শহীদ মিনার। কিন্তু সেই শহীদ মিনার বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি। তবে যতবার এটি ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে ততবারই এ দেশের মানুষ নির্মাণ করেছে।

কোনটি প্রথম শহীদ মিনার

শহীদ মিনার হচ্ছে ভাষাশহীদদের উদ্দেশে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে এই স্তম্ভ নির্মিত হয়। এটি বর্তমানে ‘শহীদ মিনার’ নামে পরিচিত। যদিও রাজশাহীতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতেই আরেকটি শহীদ মিনার নির্মাণের দাবি করেন রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের সংগঠকরা। তারা বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতেই রাজশাহী কলেজের হোস্টেলে ইট ও কাদা দিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। এই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে তারা লিখেছিলেন, ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ এই দুঃসাহসিক কাজে যোগ দিয়েছিলেন কলেজের কয়েকজন কর্মচারীও। এর স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। আন্দোলনকারীরা সারা রাত ধরে এটি পাহারা দেন, যেন শাসকগোষ্ঠী এটি ভেঙে ফেলতে না পারে। পরদিন সকালে আন্দোলনকারীরা সে স্থান ত্যাগ করলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে পুলিশ সেই শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। ঢাকায় এখন যেখানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অবস্থিত সেখানেই ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। এটিই স্বীকৃত প্রথম শহীদ মিনার।

এই শহীদ মিনারটির পরিকল্পনা, স্থান নির্বাচন ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের উদ্যোগে। বর্তমান শহীদ মিনারের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে সাড়ে ১০ ফুট উঁচু এবং ৬ ফুট চওড়া ভিত্তির ওপর ছোট স্থাপত্যটির নির্মাণকাজ শেষ হলে এর গায়ে ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ লেখা একটি ফলক লাগিয়ে দেওয়া হয়। নির্মাণের পরপরই এটি প্রতিবাদী আন্দোলনের প্রতীকী মর্যাদা লাভ করে। দলে দলে মানুষ ভিড় জমায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে এটি উদ্বোধন করেন সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। ওই দিন বিকেলে পুলিশ মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ঘেরাও করে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলে।

যেভাবে শুরু শহীদ দিবস পালন

প্রথম নির্মিত শহীদ মিনারটি পুলিশ ভেঙে ফেললেও পাকিস্তানি শাসকরা ভাষার জন্য জীবনদানকারী শহীদের ভুলিয়ে দিতে পারেনি। পরের বছর থেকেই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের আদলে অসংখ্য শহীদ মিনার নির্মিত হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হতে থাকে। মেডিকেল কলেজের যে স্থানে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি ছিল সেখানে লাল কাগজে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের অবিকল প্রতিকৃতি স্থাপন করে তা কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়। সেখান থেকেই ১৯৫৩ সালে ছাত্রদের প্রথম প্রভাতফেরি শুরু হয়। পরের বছরও ছাত্ররা একইভাবে শহীদ দিবস পালন করে।

পুনর্নির্মাণ

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী ইশতেহারে ২১ দফা পেশ করে। এর মধ্যে শহীদ মিনার তৈরি, একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ঘোষণা, শহীদ দিবসে সরকারি ছুটি ঘোষণা প্রভৃতি প্রতিশ্রুতি ছিল। ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে। তারা ৯ মে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে শহীদ মিনার তৈরির অনুমোদন, একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু তারা এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ৩০ মে তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়।

১৯৫৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন পূর্ববঙ্গ সরকারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং ভাষাশহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম। সে সময়ই একুশে ফেব্রুয়ারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৫৭ সালে শিল্পী হামিদুর রহমানের পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণের একাংশে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু হয়। হামিদুর রহমানের সহকর্মী হিসেবে ছিলেন ভাস্কর নভেরা আহমদ। কিন্তু বেশ কিছু কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এই উদ্যোগ আবারও ব্যাহত হয়। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে সামরিক আইন জারি হওয়ার পর শহীদ মিনার তৈরির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত চার বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে মানুষ এই অসম্পূর্ণ শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করেই শহীদ দিবস পালিত হয়েছে। ১৯৬২ সালে আবারও শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খানের নির্দেশে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের আগের নকশা পরিবর্তন করে নতুন নকশা দাঁড় করানো হয়। ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নবনির্মিত এই শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন শহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগম।

’৭১-এ আবারও আক্তান্ত হলো

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী শহীদ মিনার আবারও ভেঙে দেয়। সেখানে ‘মসজিদ’ কথাটি লিখে রাখে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে পুনরায় শহীদ মিনার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মূল নকশা অনুসরণ না করে ১৯৬৩ সালের সংক্ষিপ্ত নকশা অনুসরণ করা হয়। ১৯৭৬ সালে নতুন নকশা অনুমোদিত হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ১৯৮৩ সালে মিনার চত্বরের স্থান কিছুটা বর্ধিত করলে শহীদ মিনারটি বর্তমান অবস্থায় আসে।

সূত্র : বাংলাপিডিয়া

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত