ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ নিয়ে গাজায় চরম অবিশ্বাস

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:০০ এএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ (বিওপি)-এর প্রথম বৈঠক ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হলেও, তা নিয়ে কোনো আশার আলো দেখছেন না ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা। দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনে বিধ্বস্ত গাজাবাসীর কাছে এই কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল ‘কাগুজে প্রতিশ্রুতি’ হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, গাজা পুনর্গঠন তহবিলে ৯টি দেশ ৭ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি পাঁচটি দেশ গাজায় ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা বাহিনী’ মোতায়েনে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র এই বোর্ডে ১০ বিলিয়ন ডলার অনুদান দেবে, যদিও এই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি।

ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে ঘিরে গাজার রাজপথ থেকে শুরু করে বাস্তুচ্যুতদের তাবুগুলোতে চলছে চরম অবিশ্বাস। দেইর আল-বালাহ’র একটি তাবুতে আশ্রয় নেওয়া ৪৩ বছর বয়সী আমাল জুদাহ বলেন, আমি গাজার জন্য অর্থ সংগ্রহের কথা অনেক শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে আমরা কিছুই পাই না। আমার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, স্বামী ও সন্তানরা আহত। আমরা শুধু ত্রাণ নয়, একটি স্থায়ী সমাধান আর পুনর্গঠন চাই।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের টানা দুই বছরের ‘গণহত্যামূলক’ যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া গাজা পুনর্গঠনে প্রয়োজন অন্তত ৭০ বিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় ট্রাম্পের ঘোষিত ১৭ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত নগণ্য।

গত বছরের অক্টোবরে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ঘোষিত তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর গাজার পরিস্থিতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই বছরে ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকেও ইসরায়েলি সেনার গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৬০০ জন।

রাফাহ থেকে বাস্তুচ্যুত ৭০ বছর বয়সী আওয়াদ আল-গুল আক্ষেপ করে বলেন, ইসরায়েল প্রতিদিন চুক্তি লঙ্ঘন করছে, বোমাবর্ষণ করছে, বাফার জোন বাড়াচ্ছে—অথচ কেউ তাদের থামাচ্ছে না। যে বোর্ড গাজার মতো ছোট্ট একটি জায়গায় ইসরায়েলকে থামাতে পারে না, তারা বিশ্বের অন্যান্য সংঘাত কীভাবে মেটাবে?

গাজার সাধারণ মানুষের ধারণা, এই বিশাল অঙ্কের ফান্ডের খুব সামান্য অংশই সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাবে। আল-গুলের মতে, এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হবে কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক খরচ আর উচ্চাভিলাষী বেতনের পেছনে। গাজায় আসবে ছিটেফোঁটা, যাতে তারা নিজেদের ‘বিলাস ক্লাব’ বা এই বোর্ড অব পিস-এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে।

একই সুর শোনা গেল ৬৬ বছর বয়সী জামাল আবু মাখদেহ’র কণ্ঠে। তিনি বলেন, ইসরায়েল যে বিষয়ে একমত হয়, তা আমাদের স্বার্থে হতে পারে না। এটি মূলত শক্তি প্রদর্শন আর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম।

যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে হামাসকে অস্ত্র সমর্পণের যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। মাখদেহ মনে করেন, হামাসকে নিরস্ত্র করার মূল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনিদের গৃহযুদ্ধে ঠেলে দেওয়া। তিনি বলেন, একদিকে শান্তিচুক্তির কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিম তীরে ঘরবাড়ি ধ্বংস ও বসতি স্থাপন অব্যাহত রয়েছে। এগুলো সবই সংবাদমাধ্যমের জন্য আইওয়াশ।

গাজাবাসীর কাছে বর্তমানে ঘরবাড়ি তৈরির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবনের নিরাপত্তা। আল-গুল বলেন, ইসরায়েল যদি ধ্বংস করা চালিয়েই যায়, তবে পুনর্গঠন করে কী লাভ? আগে তাদের হাত থামাতে হবে।

দীর্ঘ দুই বছর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত গাজাবাসী এখন শুধু স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। তাদের দাবি সামান্য—নিরাপত্তা, শান্তি এবং নিজ ভিটায় প্রত্যাবর্তন। রাফাহ’র বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা বলছেন, তাবু খাটিয়ে হলেও তারা নিজ এলাকায় ফিরতে চান, যদি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

বোর্ড অব পিস বিশ্বশান্তির স্বপ্ন দেখালেও, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া গাজাবাসীর কাছে তা কেবলই এক অস্পষ্ট এবং অবিশ্বাসের নাম।

সূত্র: আল-জাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত