প্রায় ৬ হাজার বছর আগের কথা। তখন পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় এক বিশাল অঞ্চল ছিল। এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভাষা পরিবার। সে ভাষার নাম হলো ইন্দো-ইউরোপীয়। ইউরোপ, এশিয়াসহ বিশ্বের প্রায় সব ভাষা এখান থেকে এসেছে। সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, জার্মান, রুশ, গ্রিক, ফরাসি, লাতিনসহ প্রধান ভাষাগুলো এ ভাষারই অংশ। ইন্দো ইউরোপীয় ভাষার অনেক শাখা ছিল। এখনো বেশ কিছু শাখা টিকে আছে। এসব শাখা হলো ইতালিক, জার্মানিক, ইন্দো ইরানিয়ান, গ্রিক, লাতিন ইত্যাদি। এদের মধ্যে ইন্দো ইরানিয়ান একটি প্রধান শাখা। ইন্দো ইরানীয় শাখা ইরানের মালভূমিতে বসতি গড়ে। কিন্তু ইন্দো-আর্য শাখা খ্রিস্টপূর্ব ১৫শ থেকে ১২শ শতকের দিকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের ‘হিন্দুকুশ’ পর্বত হয়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল দিয়ে পাঞ্জাবে আসে। এখানে তারা বসতি গড়ে। এই ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী নিজেদের ‘আর্য’ বলত। তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের উন্নত মনে করত তাদের ভাষার নাম, আর্য ভাষা। তাদের জীবনব্যবস্থা কেমন হবে, কীভাবে দেব-দেবীর উপাসনা করবে তার নিয়ম-পদ্ধতি ঠিক করার জন্য চারটি গ্রন্থ রচনা করে। ঋগে¦দ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ নামে আর্যরা চারটি বেদ রচনা করে। এর মধ্য দিয়ে ভারতে তারা বৈদিক সংস্কৃতির সূচনা করে। কিন্তু এ ভাষার ব্যাকরণ, উচ্চারণ, বাক্য গঠন সবই ছিল জটিল।
আর্য ছাড়া স্থানীয়রা এ ভাষায় প্রায় কথা বলতে পারত না। সে সময় ‘পাণিনি’ নামে এক পণ্ডিত ছিলেন। তিনি বৈদিক সংস্কৃতের সমস্যা অনুভব করেন। তখন এটি সংস্কার করে নিয়মের মধ্যে আনেন। এ জন্য তিনি আট অধ্যায়ের একটি ব্যাকরণ বই রচনা করেন বইটির নাম দেন ‘অষ্টাধ্যয়ী’। এই ‘অষ্টাধ্যয়ী’ বই পৃথিবীর প্রথম সৃজনশীল ব্যাকরণ বলে অনেকে মনে করেন। তাই ‘সংস্কৃত’ এমন একটি ভাষা যার ধ্বনি, ব্যাকরণ, শব্দগঠন, ছন্দ, সবকিছু নিয়মে বাধা। পাণিনির সংস্কারের পর বৈদিক সংস্কৃত হয় বিশুদ্ধ সংস্কৃত বা ধ্রুপদি সংস্কৃত। তখন এ ভাষায় রামায়ণ, মহাভারত, ভগবতগীতা, কালীদাসের কাব্য নাটক, দর্শনশাস্ত্রসহ নানা গ্রন্থ রচিত হয়। সংস্কৃত শুধু একটি ভাষা নয় এটি ভারতীয় সভ্যতা, শিল্প-সাহিত্য দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার প্রাণ। হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র ভাষা সংস্কৃত। পাণিনির সংস্কৃত ভাষা খ্রিস্টপূর্ব ৫শ থেকে প্রায় মধ্যযুগ পর্যান্ত টিকে ছিল। ভারতে প্রধান প্রাকৃত ভাষা হলো মাগধী, অর্ধমাগধী, উড়িয়া, গৌড়ীয়, শৌরসেনী ইত্যদি। খ্রিস্টপূর্ব ৫ শতক থেকে ১২শ শতক পর্যন্ত এই ভাষা ছিল। আবার ‘পালি’ একক অঞ্চলের কোনো বিশেষ ভাষা নয়। এটি বিভিন্ন প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ নিয়ে গড়ে ওঠা এক ধর্মীয় সাহিত্য। প্রাচীন ভারতে অনেক প্রাকৃত ভাষা ছিল। কোন প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষা এসেছে, সে আলোচনা শেষ হয়নি। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও তার অনুসারীরা মনে করতেন, মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষা এসেছে। কিন্তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং তার অনুসারীদের মত ভিন্ন। তারা মনে করেন, বাংলা ভাষা এসেছে গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে। তবে মাগধী বা গৌড়ীয় যেটি হোক না কেন প্রাকৃত ভাষা থেকে যে বাংলা ভাষা এসেছে, সেটি নিশ্চিত।
এবার দেখা যাক, এই জনপদে কীভাবে বইমেলা শুরু হয়েছিল। সেও প্রায় অনেক আগের কথা। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের গোড়ার দিকের ঘটনা। তখন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দীন বাংলা একডেমিতে চাকরি করেন। সে সময় একাডেমি অনেক বিদেশি বই সংগ্রহ করত। এর মধ্যে একটি বই ছিল একেবারে অন্য রকম। বইটির নাম ‘ওয়ানডারফুল ওয়ার্ল্ড অব বুকস’। হঠাৎ দুটি শব্দে তার চোখ আটকে যায়। ‘বুক ও ফেয়ার’। মানে! বইমেলা, দারুণ তো! বৈশাখী, নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড়সহ কত মেলা আছে। বইমেলা নামে কিছু হতে পারে, এটা তিনি আগে ভাবেননি। এ সময় তিনি ইউনিসেফের একটি বিশেষ প্রকল্পে যুক্ত হন। এ প্রকল্প তার বই মেলার ভাবনাকে আরও উসকে দেয়। এটি ছিল শিশু-কিশোর গ্রন্থমেলা উন্নয়ন প্রকল্প। শিশু-কিশোরদের জন্য এ প্রকল্পে বই সংগ্রহ হয়। এসব বই নিয়ে ১৯৬৫ সালে তিনি একটি শিশু গ্রন্থমেলা করেন। কিন্তু শিশু-কিশোরদের এ মেলা সরদার জয়েনউদ্দীনকে তৃপ্ত করতে পারেনি। এ জন্য ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জে তিনি বড় পরিসরে একটি বইমেলার আয়োজন করেন। সবার আনন্দের জন্য এখানে একটি মজার বিষয় উপস্থাপন করেন। তিনি মেলায় একটি গরু বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করেন। গরুটির গায়ে লেখা ছিল, ‘আমি বই পড়ি না।’ সরদার জয়েনউদ্দীনের এই কৌতুক, সবাইকে যথেষ্ট হাসির খোরাক দিয়েছিল। অনেককে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। এখানেই তিনি থেমে থাকেননি।
১৯৭২ সালকে ইউনেসকো ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ ঘোষণা করে। সরদার জয়েনউদ্দীনও ওই বছরই গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হন। আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষকে কেন্দ্র করে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে তিনি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। সেই থেকেই বাংলা একাডেমিতে বইমেলার সূচনা। তবে ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমির বইমেলা হয়নি। ১৯৭৪ সালে হয় জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন। এ উপলক্ষে নিজামী, চিত্তবাবু, বর্ণমিছিলসহ কয়েকজন প্রকাশক কিছু বই নিয়ে একাডেমিতে আসেন। তারা বই নিয়ে একাডেমির পূর্ব দিকের দেয়াল ঘেঁষে বসে যান। ক্ষুদ্র পরিসরে এটাই ছিল বাংলা একাডেমির বইমেলা। পরিপূর্ণভাবে অমর একুশে বইমেলার শুরু হয় ১৯৮৪ সাল থেকে। তারপর প্রতি বছর এর আয়তন ও স্টলের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এভাবে বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে বাংলা একাডেমির বইমেলা সম্প্রসারিত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এটা প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায়, বইমেলার জন্যই বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্প সমৃদ্ধ হয়েছে। এক মাস ধরে এই মেলা চলতে থাকে। পৃথিবীতে এত দীর্ঘ সময় ধরে আর কোনো বইমেলা চলে বলে জানা নেই। আজ বইমেলা শুধু মেলা নয়। এটি এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। বাংলা ভাষার ইতিহাস যেমন দীর্ঘ, তেমনি দীর্ঘ বইপ্রেমের উৎসবও।
লেখক : কবি, লেখক ও সাংবাদিক
