শিশুকে আমরা আঙুল ধরে হাঁটতে শেখাই, কথা বলতে শেখাই। এটাই শিশুর শিক্ষার ভিত্তি। মা-বাবার কাছ থেকে যে শিক্ষার শুরু, তাই প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের প্রথম পদক্ষেপ। প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিকত্ব এখানেই, ওই শিক্ষাই একজনকে পরবর্তী জীবনের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক আদর্শের ও নৈতিকতাপূর্ণ মুক্ত স্বাধীন জানালায় মুক্ত করে দেয়। সে নতুন দুনিয়ায়, নতুন পরিবেশে নতুন মানুষ হিসেবে নিজেকে চিনতে পারে। এই চেনাই একজন তরুণের প্রথম ও প্রধান উপলব্ধি। সে যদি নিজেকে চেনে, পরিবারকে চেনে, দেশ ও জনগণকে চেনে, তাহলে ডিরেইল্ড হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। আর শিক্ষকরা শিশু, তরুণ শিক্ষার্থীদের গুরু হয়ে ওঠেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে ওই গুরু হওয়ার প্রবণতা কম। তারা ক্লাসে পাঠদানের প্রতি মনোযোগী নন পুরোপুরিভাবে। তারা ব্যক্তিগত কাজে অধিক সচল, তার মূল দায়িত্ব যে জাতির মেরুদ- নির্মাণ, ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং যারা আগামীর নেতাকর্মী দেশ গঠনের শক্তিশালী ভিত, তাদের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেন ঢিলেঢালাভাবে। এই মনোভাব আজকের নয়, বহু পুরনো।
দাবি আদায়ে তাদের লাগাতার কর্মসূচি পালনে যতটা প্রাণাবেগী, সেই রকম যদি স্কুলিংয়ে অবদান রাখতেন, তাহলে জাতির উপকার হতো। এবং শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনকে এ কথা বলতে হতো না যে, দেশ গড়ার দায়িত্ব শিক্ষকদের। তাদেরই এ দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষকরা তো দায়িত্বে আছেনই, তাহলে তাকে এ কথা বলতে হবে কেন? গত শনিবার রাজধানীর মিরপুর-১৩ নম্বরের পিটিআইয়ে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোচনায় তিনি ওই দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন শিক্ষকদের। আমরা আদর্শ হিসেবে শিক্ষকদেরই জাতির মেরুদ- নির্মাতা বলে জানি। সমাজে শিক্ষকরা হচ্ছেন সবচেয়ে যোগ্য, বিশ্বাসী ও অনুকরণযোগ্য শ্রদ্ধাভাজন প্রতিনিধি। শিক্ষামন্ত্রী মিলন দুর্নীতির চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা প্রকৃত সত্য। শুধু অর্থ লোপাটই দুর্নীতি নয়। আপনি যদি আপনার দায়িত্ব ঠিক সময়ে সঠিকভাবে সম্পাদন না করেন, সেটাও বড় দুর্নীতি। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের রেখে যদি রাজপথে দাবি আদায়ে সময় ব্যয় করেন, সেটাও দুর্নীতি। দাবিদাওয়া থাকবেই, পদোন্নতি চাইবেন, তাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু ক্লাস বর্জন করে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা না দিয়ে ওই কাজ করলে, বেতন-ভাতা নিলে তাও দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। সরকার তার সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেও প্রকৃত সমস্যার সমাধান করতে উদ্যোগী হয়। তাতে সময় একটু বেশি লাগলেও, সেটা বুঝতে হবে। আর গ্রেড পরিবর্তনের দাবি যে মৌলিক স্ট্রাকচারবিরোধী, রাতারাতি তা করা যায় না, তা বুঝতে হবে শিক্ষকদের।
শিক্ষকরা যদি এগুলো না বোঝেন, তাহলে সমাজের অন্যরা কী করে তা বুঝবেন? কারণ তারাই তো সমাজ-সংসারের যত সু-যুক্তির শিক্ষা দেন, তা কি সামাজিক মানুষের পক্ষে দেওয়া সম্ভব? রাজনীতিকরাও তাদেরই সন্তান, প্রশাসনের লোকেরাও তাদেরই প্রোডাক্ট। আজ প্রশাসন, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি তার দায় কি কেবল রাজনৈতিক সরকারের কাঁধে বর্তাবে, নাকি শিক্ষকদের কাঁধেও? প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের যে অবনতি, তার জন্য কেবল পুরনো কারিকুলাম নয়, কারিকুলাম কেন সময়োপযোগী আন্তর্জাতিক মানের হলো না? আমাদের শিক্ষার্থীরা তো হার্ভার্ড, এমআইটি বা কেমব্রিজ, কর্নেল, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিযোগী, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ শিক্ষায় এআই নিয়ে আমাদের এগুতে হবে প্রতিযোগিতায়। যদি শিক্ষা ভিত্তিতে সেই গুণ ও প্রজ্ঞার সূচনা না করা যায়, তাহলে আমরা হেরে যাব, পেছনে পড়ে থাকবে জাতির আশা-আকাক্সক্ষা। এজন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিকসহ উচ্চশিক্ষালয়ের ভেতরে যে দুর্নীতির ঘুণপোকা রয়েছে, তার মূলোৎপাটন জরুরি। শিক্ষামন্ত্রীকে তার কথার সূত্র ধরেই এগোতে হবে, এর বিকল্প নেই।
