বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে ব্যয় সংকোচনের পথে সরকার

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম

বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে জনজীবনে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা বিবেচনায় রেখে দাম না বাড়িয়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে নবনির্বাচিত সরকার। সেক্ষেত্রে অযাচিত ব্যয় কমানো এবং সাশ্রয়ী হতে বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্তত আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে কীভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যায় সে পথে হাঁটতে চায় সরকার।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার বিদ্যুৎ খাতের বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ বিভাগের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বৈঠকে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিমসহ বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিদ্যুৎ খাতের সরকারি কোম্পানিগুলোর আর্থিক, কারিগরি ও সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত অর্থবছরেও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এর সঙ্গে নতুন করে দেনা জমেছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে।

এ অবস্থায় বিপিডিবি ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে ভর্তুকি ও লোকসান কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে বৈঠকে উপস্থিত দুই মন্ত্রী দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে সায় দেননি বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রীরা বিদ্যুৎ খাতের অপারেশনাল খরচ কমানো, সিস্টেম লস  হ্রাস এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত ট্যারিফ নেগোসিয়েশন কমিটির মাধ্যমে উৎপাদন পর্যায়ে ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ করে সংকট মোকাবিলার পথ খুঁজতে কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ব্যয় কমিয়ে কীভাবে সামগ্রিক চাপ কমানো যায়, সে বিষয়ে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দুই মন্ত্রীর মনোভাব স্পষ্টদাম না বাড়িয়ে কীভাবে সংকট সামাল দেওয়া যায়, সেটাই তাদের মূল লক্ষ্য। সিস্টেম লস কমানো, অপারেশনাল ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ট্যারিফ নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে ভর্তুকি কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুৎ খাতে পিডিবির বিপুল ঋণ জমেছে। সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জ্বালানি আমদানির বিপরীতে বড় অঙ্কের দেনা রয়েছে। এসব পাওনাদারের অর্থ পরিশোধ করতেই হবে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ফারাক থাকায় প্রতি বছর ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে হয় দাম বাড়াতে হবে, নয়তো অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। কোন পথে সরকার যাবে, সেটি নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের বিষয়।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমাতে হলে নিয়মিত দাম সমন্বয় প্রয়োজন। তা না হলে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না।

লিটারে ১৬ টাকা কমল ফার্নেস অয়েলের দাম : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরবরাহকৃত ফার্নেস অয়েলের ভোক্তাপর্যায়ের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। নতুন নির্ধারিত দাম প্রতি লিটার ৭০ টাকা ১০ পয়সা, যা গতকাল রবিবার রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে ফার্নেস অয়েল প্রতি লিটার ৮৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। সে হিসাবে প্রতি লিটারে দাম কমল প্রায় ১৫ টাকা ৯০ পয়সা।

গতকাল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এ-সংক্রান্ত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ৩৪ (৪) ও ৩৪ (৬) অনুযায়ী ফার্নেস অয়েলের ভোক্তাপর্যায়ের মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফার্নেস অয়েলের মূল্য পুনর্নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ২০২৪ সালের ২০ জানুয়ারি কমিশনে প্রস্তাব দাখিল করে। পরে তেল বিপণন কোম্পানিগুলোও ফার্নেস অয়েল বিপণনে তাদের বিপণন চার্জ ও সমন্বিত পরিবহন চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ২০২৫ সালের ২৬ মে, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ৩ জুন, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ২৬ জুন এবং পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ১১ জুলাই প্রস্তাব জমা দেয়। এসব প্রস্তাবের ওপর চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি বিইআরসি গণশুনানি গ্রহণ করে। প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠান ও আগ্রহী পক্ষগুলোকে গণশুনানির পর ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লিখিত মতামত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

কমিশন জানায়, সব প্রস্তাব ও মতামত বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের পর আইনের আওতায় ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিপিসি সরবরাহকৃত ফার্নেস অয়েলের ভোক্তাপর্যায়ের মূল্য প্রতি লিটার ৭০ দশমিক ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফার্নেস অয়েল বিপণনে পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল কোম্পানি এবং স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানির বিপণন চার্জ প্রতি লিটার ৭২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সমন্বিত পরিবহন চার্জ ধরা হয়েছে প্রতি লিটার ১ টাকা ২০ পয়সা।

বিইআরসি জানায়, ফার্নেস অয়েলের পুনর্নির্ধারিত এই মূল্যহার রবিবার রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কার্যকর হবে। মূল্য পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

এদিকে ফার্নেস অয়েলের দাম কমায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত