প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবসহ তিন সচিবকে সরানো হলো

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম

বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবসহ (সদ্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন) তিন সচিবকে নিজ পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের নয়জন জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদমর্যাদায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার।

গতকাল সোমবার পৃথক প্রজ্ঞাপনে এসব সিদ্ধান্ত জানিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এদিন দুই মন্ত্রীর পিএস এবং পাঁচ প্রতিমন্ত্রীর এপিএস নিয়োগ দিয়েও প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিনকে নিজ পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

নয়জনের চুক্তিভিক্তিক নিয়োগ বাতিল : গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আলাদা আলাদা প্রজ্ঞাপনে নয়জন সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়।

যাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে তারা হলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) এএম আকমল হোসেন আজাদ, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মোহাম্মদ ইউসূফ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, বিশ্ব ব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক বেগম শরিফা খান, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক (সিনিয়র সচিব) সিদ্দিক জোবায়ের, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) মো. মোখলেস উর রহমান ও পরিকল্পনা কমিশনের কাইয়ুম আরা বেগম।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারের এ অফিস আদেশ শিগগিরই কার্যকর হবে।

এর আগে নতুন সরকার গঠনের আগের তিন দিনে জনপ্রশাসনের দুটি শীর্ষ পদের দুজন কর্মকর্তা নিজে থেকে সরে যান। তাদের একজন হলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ, অন্যজন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া। এরপর চুক্তিতে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় অবসরপ্রাপ্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তারকে। তিনি এর আগে বিএনপির চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

প্রশাসনে আরও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে এমন আভাস দিয়ে সচিবালয়ের সূত্রগুলো বলছে, এ ক্ষেত্রে খালি হওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ চারটি সচিবের পদে যেমন নিয়োগ দেওয়া হবে, তেমনি চুক্তিতে থাকা কয়েকজন সচিবের জায়গায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। এ ছাড়া মাঠপ্রশাসনের জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পদে পরিবর্তন আসতে পারে।

একইভাবে পুলিশসহ অন্যান্য সরকারি দপ্তরেও পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। এসব নিয়ে এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ পদ পেতেও তৎপর।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়। এরপর প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়। প্রথম ছয় মাসেই সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে ১৪ জন, গ্রেড-১ পদের ১ জন ও অতিরিক্ত সচিব পদের ১৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সময়ে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদের ২৩ জন, গ্রেড-১ পদের ২ জন ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৫১ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। এরপরও আরও বেশ কিছুসংখ্যক কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়।

অন্যদিকে সচিবসহ বেশ কিছু পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, বর্তমানে শুধু সচিব ও সমপর্যায়ের পদে অন্তত ১৬ জন কর্মকর্তা চুক্তিতে আছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনপ্রশাসনে নতুন সরকার এসে পরিবর্তন আনবেন, এটা অস্বাভাবিক নয়। তবে তারা আশা করেন, নতুন সরকার অতীতের সরকারগুলোর মতো দলীয়করণ করবে না এবং তা করতে গিয়ে অযোগ্যদের নিয়োগ দেবে না এবং কোনো কর্মকর্তা ‘প্রতিহিংসার’ শিকার হবেন না।

ক্ষমতাসীন বিএনপির ইশতেহারেও এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি আছে। বলা হয়েছে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।

দুই মন্ত্রীর পিএস, পাঁচ প্রতিমন্ত্রীর এপিএস নিয়োগ : এদিকে নতুন সরকারের দুজন মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের একান্ত সচিব নিয়োগ পেয়েছেন ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) উপসচিব মো. মনিরুজ্জামান। ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর একান্ত সচিব হয়েছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের সচিব (উপসচিব) রবীন্দ্র চাকমা। এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হয়েছেন মো. ইব্রাহিম খলিল। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রয়েছেন মো. আমিনুল হক।

বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট এবং শিল্প প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হয়েছেন মো. জুনাইদ। মো. শরীফুল আলম এ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হয়েছেন মো. আল মামুন। এমএ মুহিত স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।

ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হয়েছেন মো. শরীফুল ইসলাম। এ দুই মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন ফকির মাহবুব আনাম। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় মাহদী আমিনের একান্ত সচিব নিয়োগ পেয়েছেন ক্যান্টনমেন্ট রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারহান লাবীব জিশান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত