রমজান মুসলমানদের কাছে সংযম, সহমর্মিতা ও মানবিকতার মাস। এই মাসটি আমাদের শেখায় নিজের কষ্টের মধ্যেও অন্যের কথা ভাবতে, মুনাফার চেয়ে নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিতে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে রোজা এলেই সাধারণ মানুষের মনে প্রথম যে অনুভূতিটি জাগে তা হলো ইবাদতের আনন্দ নয়, বরং বাজার নিয়ে এক ধরনের অজানা আতঙ্ক। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে, এটা যেন সবাই আগেভাগেই ধরে নেয়। এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই রোজার শিক্ষা ধারণ করি, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালন করি? এই প্রশ্নটা আমার কাছে আরও গভীর হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। রমজানের ঠিক এক সপ্তাহ আগে থেকেই লন্ডনের বাজারে যা দেখেছি, তা আমাকে বিস্মিত করেছে। সেখানে বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, সুপারমল যাদের মালিক বা ব্যবস্থাপকরা অনেকেই মুসলমান নন, রমজান উপলক্ষে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। রোজাদারদের কষ্ট লাঘবের জন্য নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা হয়েছে, কোথাও কোথাও ছাড় দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এই মাসে কেউ যেন অতিরিক্ত আর্থিক চাপে না পড়ে। বিধর্মীরাও যেখানে রোজাকে সম্মান করে, রোজাদারদের স্বস্তির কথা ভাবে, সেখানে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে বাংলাদেশের বাজারে এসে যখন দেখি ব্যবসায়ী নির্বিকারভাবে সব কিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্নটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে রমজান কেন কিছু মানুষের কাছে ইবাদতের মাস নয়, বরং মুনাফার মৌসুম। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা। বছরের পর বছর ধরে চলমান কাঠামোগত সংকট প্রমাণ করে, রাষ্ট্র বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
একটি কার্যকর রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা। যখন সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা দেখা যায়, তখন বাজার নিজস্ব নিয়মে চলতে শুরু করে, যেখানে শক্তিশালীরাই জয়ী হয়। নতুন সরকারের জন্য এ সংকট আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ জনগণ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে শেষ ভরসা হিসেবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা মানে শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি প্রশাসনিক অদক্ষতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার প্রতিচ্ছবি। এদেশে সিন্ডিকেট অদৃশ্য নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লালিত এক দানব। বাংলাদেশের বাজারে সিন্ডিকেট কোনো গুজব বা রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি একটি সুসংগঠিত বাস্তবতা। আমদানিকারক, পাইকার, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মিলিতভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তারা পণ্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং দাম বাড়িয়ে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন করে। এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো তাদের অনেকেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় নিরাপদ। ফলে সাধারণ অভিযান বা ভোক্তা অধিকার আইনের দুর্বল প্রয়োগে তারা বিচলিত হয় না। নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই এই সিন্ডিকেট ভাঙার সাহস দেখানো।
একটি সুস্থ বাজার ব্যবস্থায় উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে, একটি যৌক্তিক মূল্য কাঠামো থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সেই কাঠামো কার্যত অনুপস্থিত। কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করে এবং ভোক্তা যে দামে কেনে তার ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেশি। এই ব্যবধান প্রমাণ করে যে, মধ্যস্বত্বভোগীরা সীমাহীন মুনাফা করছে। যদি মাঠ পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যন্ত একটি সরকার নির্ধারিত ও তদারকিকৃত মূল্য কাঠামো কার্যকর করা যায়, তাহলে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমবে। বাজার ব্যবস্থায় কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা ন্যায্যমূল্য পায় না। অন্যদিকে ভোক্তা সেই একই পণ্য কিনতে বাধ্য হয় দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে। এই দ্বিমুখী শোষণ কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি পরিকল্পিত। মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে কৃষককে দুর্বল রাখে এবং ভোক্তার বিকল্প পথ বন্ধ করে দেয়। নতুন সরকারের দায়িত্ব হলো,এই চক্র ভেঙে সরাসরি কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সংযোগ জোরদার করা। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত, মনিটরিং টিম ও ভোক্তা অধিকার সংস্থা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব কার্যক্রম অনেক সময়ই লোক দেখানোতে সীমাবদ্ধ থাকে। কোথাও ঘুষ, কোথাও রাজনৈতিক চাপ, কোথাও আবার নিছক উদাসীনতা সব মিলিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। নতুন সরকার যদি প্রশাসনের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালাতে না পারে, তাহলে বাজার নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। সৎ ও সাহসী কর্মকর্তাদের ক্ষমতায়ন এখন সময়ের দাবি। মনিটরিং সেল গঠনের ঘোষণা নতুন কিছু নয়। নতুনত্ব আনতে হবে এর কার্যকারিতায়।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যদি সৎ কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গ্রহণযোগ্য রাজনীতিবিদদের নিয়ে শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করা যায়, তাহলে বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে। এই সেলগুলোর থাকতে হবে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল ও মজুদ জব্দ করার বাস্তব ক্ষমতা কেবল সুপারিশ করার নয়। এদিকে সুশীল সমাজ দীর্ঘদিন ধরে বাজার সংকটে প্রায় নীরব। অথচ তাদের নৈতিক শক্তি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। মাঠ পর্যায়ে বাজার পর্যবেক্ষণ, তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন এবং গণমাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা এখন সময়ের দাবি। নতুন সরকার যদি সত্যিই স্বচ্ছতা চায়, তাহলে সুশীল সমাজকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিটি সরকারই বলে সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কারণে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রশ্ন একটাই, নতুন সরকার কি সেই সদিচ্ছা দেখাবে? সেনাবাহিনীকে বাজার নিয়ন্ত্রণে যুক্ত করার প্রস্তাব বিতর্কিত হলেও বাস্তবতা হলো, অতীতে এটি কার্যকর হয়েছে। বিশেষ করে, রোজার মতো সংবেদনশীল সময়ে সাময়িকভাবে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সিন্ডিকেটকে ভীত করে। এটি স্থায়ী সমাধান নয়, কিন্তু একটি শক্ত বার্তা। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সাফল্য মানে জনগণের আস্থা অর্জন, আর ব্যর্থতা মানে বিশ্বাসের সংকট। রোজা আসবে, যাবে। কিন্তু এই সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত ইতিহাসে লেখা থাকবে। বাজার যদি সিন্ডিকেটের হাতে থাকে, তবে রাষ্ট্র দুর্বল। আর বাজার যদি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে, তবে জনগণ শক্ত হয়। নতুন সরকারের সামনে প্রশ্ন এখন একটাই, তারা কাদের পক্ষে দাঁড়াবে?
লেখক : সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক
