সরকার দেশকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়

একুশে বইমেলা উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০০ এএম

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়।’ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলা একাডেমিতে বইমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বেলা ৩টা ১২ মিনিটে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পরে ৩টা ১৬ মিনিটে তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে ফিতা কেটে মেলার দ্বার উন্মুক্ত করেন। উদ্বোধন শেষে তিনি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন এবং বেশ কিছু বই কেনেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বইয়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করে, যেটি মানুষের স্মৃতিশক্তি এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ায়। এমনকি আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগেরও ঝুঁকি কমায়।’

তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলা একাডেমির আয়োজনে ১৯৭৮ সাল থেকে চালু হওয়া অমর একুশে বইমেলা এখন জাতির মেধা মননের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই বইমেলার আয়োজন করা হয়। তবে আমাদের বইমেলা অন্য দেশের বইমেলার মতো নয়। আমাদের বইমেলা মাতৃভাষার অধিকার আদায় এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত। তবে প্রতি বছর মেলার আকার আয়তন বাড়লেও সেই হারে গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হচ্ছে কি না কিংবা মানুষের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ছে কি না এ বিষয়গুলো নিয়েও চিন্তাভাবনার অবকাশ রয়েছে।’

তরুণ প্রজন্মের ইন্টারনেটে আসক্তি ও বইবিমুখতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেটে বই পড়া গেলেও কাগজের পাতায় কালো অক্ষরের গভীরতা অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। গবেষকরা বলছেন, অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। তাই তরুণদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলার উপায় বের করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “৫২ সালের ভাষাশহীদদের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে আজকের এই বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমির সৃজনশীল কার্যক্রমের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘অমর একুশে বইমেলা’। তবে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বছরগুলোতে ‘অমর একুশে বইমেলা’ ‘অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’ হিসেবে আয়োজন করার সুযোগ রয়েছে কি না, সেটি বিবেচনা করা যেতে পারে।”

তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। অমর একুশে বইমেলা শুধু বই বেচাকেনার মেলা নয় বরং মেলা হয়ে উঠুক শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের সূতিকাগার।’

তিনি বলেন, ‘বইমেলা শুধু একটি নির্দিষ্ট মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর দেশের সব বিভাগ, জেলা, উপজেলায়ও আয়োজিত হতে পারে। এ ব্যাপারে বই প্রকাশকরাও উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে পারেন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।’

জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি আমাদের তরুণ-তরুণীদের মেধা ও মনন বিকাশের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মেয়াদি গবেষণাবৃত্তি, তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তর-প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও দেশজ সংস্কৃতির মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমান, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ও কন্যা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক, বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টা ৪ মিনিটে সচিবালয়ে প্রবেশ করেন। ৯টা ৩০ মিনিটে তিনি নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। এরপর মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে তিনি সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনে অবস্থিত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ৫ নম্বর গেট দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যান। অনুষ্ঠান শেষে বেলা ১২টার দিকে ৩ নম্বর গেট হয়ে ফিরে আসেন। এ সময় কন্যা জাইমা রহমান তার সঙ্গে ছিলেন।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য একদিন বিশ্বজগতে আলো ছড়াবে : রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে একুশে পদকপ্রাপ্তদের মাঝে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক ২০২৬’ প্রদানের পর দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিশ্চয়ই একদিন বিশ্বজগতে আলো ছড়াবে।’ এ সময় তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞান কিংবা শিল্প-সাহিত্যচর্চার ধারা আরও শানিত ও বিকশিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একুশে পদক প্রবর্তন করেছিলেন। এটি শুধু একটি পদকই নয়, বরং এই পদকের মধ্য দিয়ে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে স্মরণে আনার পাশাপাশি যেসব বিজ্ঞজন শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, গবেষণা চর্চায় নিজেদের এবং রাষ্ট্র ও সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাদের সঙ্গে আপামর জনসাধারণের পরিচয় ঘটে।’

জ্ঞান-বিজ্ঞান কিংবা শিল্প ও সাহিত্যচর্চার ধারা আরও শানিত এবং বিকশিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা গবেষণা এবং শিল্প-সাহিত্যের চর্চাকে আরও বেগবান করতে রাষ্ট্র এবং সরকার তার দায়িত্ব অবশ্যই পালন করবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষা গবেষণা এবং শিল্প-সাহিত্যচর্চাকে রাজনীতিকীকরণ করা কখনোই সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানে সব শাখায় যাতে দেশ এগিয়ে যেতে পারে, নৈতিক মানসম্পন্ন তেমন একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কাজ করছে।’

জাতীয় ইতিহাসে ফেব্রুয়ারি মাসের গুরুত্ব অপরিসীম উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের আত্মপরিচয়ের স্মারক। বলা যায়, আমাদের সংস্কৃতিচেতনার প্রাণপ্রবাহ একুশে ফেব্রুয়ারি। একদিকে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, অন্যদিকে এটি ছিল জালেমের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ফেব্রয়ারি মানেই আত্মপরিচয় উপলব্ধির মাস। আমাদের শেকড় সন্ধানী মাস।’

এ বছর একুশে পদক পেয়েছেন চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ফরিদা আক্তার ববিতা, চারুকলায় অধ্যাপক মো. আবদুস সাত্তার, স্থাপত্যে মেরিনা তাবাশ্যুম, সংগীতে আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর), নাট্যকলায় ইসলাম উদ্দিন পালাকার, সাংবাদিকতায় শফিক রেহমান, শিক্ষায় অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার, ভাস্কর্যে তেজস হালদার যশ এবং নৃত্যকলায় অর্থী আহমেদ। এ ছাড়া জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ওয়ারফেজ’ সংগীত দল হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত