ডা. ইকবাল মাহমুদ
কনসালট্যান্ট কার্ডিওলজিস্ট
পার্কভিউ হসপিটাল, চট্টগ্রাম
হার্টের রোগী জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও ওষুধের মাধ্যমে কোনো উপসর্গ ছাড়া সুস্থ থাকেন। বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়পড়, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ না থাকে তাহলে তারা কিছু নিয়মকানুন মেনে রোজা রাখতে পারবেন। হার্টের সমস্যা আছে কিন্তু বর্তমানে কোনো উপসর্গ নেই এবং হার্টের ফাংশন ৫০%(EF-50%)-)-এর ওপরে তারা রোজা রাখতে পারেন।
যারা রোজা রাখতে পারবেন না
সম্প্রতি হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এমন রোগীর রোজা না রাখাই ভালো। যেসব হার্ট অ্যাটাকের রোগী সঠিক জীবনযাত্রা ও ওষুধ সেবনের পরও বিশ্রামে থাকা অবস্থায় বা অল্প পরিশ্রমেই বুকে ব্যথা অনুভব করেন। হার্ট ফেইলরের রোগী সঠিক জীবনযাত্রা ও ওষুধ সেবনের পরও বিশ্রাম বা অল্প পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন।
অনিয়ন্ত্রিত হাইপ্রেশার (হাইপারটেনশন) বা হাইপ্রেশারের কারণে বুকে ব্যথা বা কিডনি বা ব্রেন বা চোখে সমস্যা হচ্ছে এমন রোগীর রোজা না রাখাই ভালো। ৩ মাসের মধ্যে হার্টে রিং বা বাইপাস সার্জারি হয়েছে। তবে রিং বা বাইপাসের ১ বছর পর যদি কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে কারা রোজা রাখতে পারবেন। ৩ মাস থেকে ১ বছর সময়টা চিকিৎসকের পরামর্শ ও রোগীর ফিটনেসের ওপর নির্ভরশীল। জন্মগত হার্টের কিছু ত্রুটি, যেগুলোতে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট বা হাত পায়ের আঙুল নীল হয়ে যায়।
রোজায় ওষুধ কীভাবে ঠিক করবেন
সাধারণত রমজানে দুইবেলা খাওয়ার ওষুধগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। একই ওষুধের মধ্যে যেগুলো দীর্ঘক্ষণ কাজ করে সেগুলো ব্যবহার করা উচিত। সকালের ওষুধগুলো ইফতারে, রাতে ওষুধগুলো সাহরিতে নেওয়া যায়। তবে ডাইইউরেটিক (Lasix, Fusid, Frulac, Spirocard, Dytor... etv) জাতীয় ওষুধগুলো সন্ধ্যায় খেতে হবে। এগুলো সাহরিতে খেলে সারা দিন প্রস্রাবের সঙ্গে শরীরের পানি সব বের হয়ে পানিশূন্যতা, প্রেশার কমে যাওয়াসহ নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে। প্রেশারের ওষুধের ক্ষেত্রেও যেগুলো ডাইইউরেটিক জাতীয় সেগুলো সন্ধ্যায় খেতে হবে। কেউ যদি শুধু একটা প্রেশারের ওষুধ খান সেটাও ইফতার বা সন্ধ্যায় খেলে ভালো। হার্টের রোগীদের কমন ওষুধগুলোর মধ্যে একটি হলো এন্টিপ্লাটিলেট (Ecisprin, Lopirel, Clopid AS, Odrel, Asclop etc) বা রক্ত জমাট না বাঁধার ওষুধ। এগুলো সাধারণত আমরা দুপুরে খাবার পরে দিয়ে থাকি। রমজানে এগুলো ইফতার বা সাহরি যেকোনো সময় খাওয়া যেতে পারে। তবে ইফতারের পরে খেলে ভালো।
খাবার-দাবার
রোজা রেখে সারা দিন না খেয়ে থাকা হয়, তাই ইফতারের হার্টের রোগীরা হঠাৎ করে অতিরিক্ত পানি জাতীয় খাবার বা শরবত খেলে সেটা শরীর এডজাস্ট করতে ঝামেলা হতে পারে। তাই অতিরিক্ত শরবত না খাওয়াই ভালো। আমরা যে খাবারগুলো ইফতারিতে খাই তার সবই তেলে মচমচে ভাঁজা। এগুলো সব ট্রান্সফ্যাট বা খারাপ চর্বিতে ভর্তি থাকে। যেগুলো হার্টের রোগীদের জন্য খুবই বিপজ্জনক। তাই হার্টে রোগীরা ইফতারে এসব ভাজাপোড়া খাবেন না। যাদের হাইপ্রেশার আছে তারা শরবতে অতিরিক্ত লবণের দিকে লক্ষ রাখবেন। একসঙ্গে অনেকটা না খেয়ে ইফতারে অল্প তারপর মাগরিবের নামাজ পড়ে একটু এবং একটু হাঁটাহাঁটির পর আবার একটু খাওয়াই উত্তম। হার্টের রোগী বা ডায়াবেটিসের রোগীদের আমরা ব্যায়াম করতে বলি। রমজানে ব্যায়ামের উপযুক্ত সময় হচ্ছে সন্ধ্যায়। সকাল বা বিকালে ব্যায়াম করতে গেলে পানিশূন্যতা, দুর্বলতা, হার্টের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। যেহেতু এবার রমজান গরমের সময়ে, তাই হার্টের রোগীরা অতিরিক্ত পরিশ্রম, অতিরিক্ত ঘাম ঝরানো থেকে দূরে থাকবেন। পানিশূন্যতা হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে।
রোজা কখন ভাঙবেন
মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুরা ছোটবেলা থেকেই রোজার প্রতি আলাদা সংবেদনশীল। তাই বড় হয়েও অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়লেও রোজা ভাঙতে চান না। অনেকেই দেখা যায় প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর কখনোই রোজা ভাঙেননি। তারা যেকোনো পরিস্থিতিতেই রোজা চালিয়ে নিতে চান। কিন্তু অসুস্থতার ক্ষেত্রে ইসলামই রোজা ভাঙা বা না রাখার বিধান রেখেছে। হার্টের রোগীদের যদি প্রচন্ড বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত পালপিটিশন, হার্ট বিটের প্রচ- ইরেগুলারিটি বা পরীক্ষা করে হার্ট অ্যাটাক পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে রোজা ভেঙে ফেলাই উত্তম। তবে হার্টের রোগী যদি রোজা রাখতে চান, তাদের জন্য ভালো হচ্ছে তারা রমজানের আগেই শাবান মাসে কিছু নফল রোজা রেখে ট্রায়াল দেওয়া। যেটা হাদিসেও বলা হয়েছে শাবান থেকে রমজানের প্রস্তুতি নিতে।