গতকাল শনিবার, সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির দিনে প্রাণ ফিরে পেয়েছে অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। সকাল গড়াতেই বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জুড়ে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। তবে দিনের মূল আকর্ষণ ছিল ‘শিশুপ্রহর’। গানের সুর, আবৃত্তি আর পাপেট শোতে এক উৎসবমুখর আয়োজন, যেখানে শিশুদের কোলাহলে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ।
ঘড়ির কাঁটা বেলা ১১টা ছুঁতেই খুলে যায় মেলার দুয়ার। উদ্বোধনের পর তৃতীয় দিনে আয়োজিত প্রথম ‘শিশুপ্রহর’ শুরু হয় বেলা ১১টা থেকে, চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। বাবা-মায়ের হাত ধরে ছোট ছোট পায়ে হেঁটে শিশুরা প্রবেশ করে বই আর কল্পনার রঙিন জগতে। চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, সংগীত আর পাপেট শো সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য আনন্দঘন পরিবেশ।
শিশুপ্রহরের আগে সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রাথমিক বাছাইপর্ব। এতে ৩৪৭ জন প্রতিযোগী অংশ নেয়। ক শাখায় ৮২ জন, খ শাখায় ১৮৫ জন এবং গ শাখায় ৮১ জন। প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ জানায়, মেলায় এত মানুষ আর এত রঙিন বই দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। আমি বড় হয়ে অনেক ছবি আঁকতে চাই, আর আমার ছবি যেন বইয়ের মলাটে ছাপা হয়।
প্রথম শ্রেণির আয়মান বলে, আমি গান গাইতে পছন্দ করি। দেশের গান গেয়েছি। অনেক ভালো লাগছে। কয়েকজন অভিভাবক জানান, তাদের বাচ্চাকে নিয়ে এসেছেন সংগীত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ
করাতে। বাসায় বসে বসে একঘেয়ে ফোন চাপার চেয়ে মেলায় আনন্দ করুক এই তাদের প্রত্যাশা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশু চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় পুতুল নাচ। রঙিন পোশাকে সাজানো পাপেটদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি মুহূর্তেই টেনে নেয় শিশুদের মনোযোগ। দুপুরের দিকে শতাধিক শিশু ও অভিভাবক গোল হয়ে বসে উপভোগ করে অনুষ্ঠান। কেউ মাটিতে বসে, কেউ মায়ের কোলে, কেউবা বন্ধুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে সব মিলিয়ে ছিল এক উচ্ছ্বাসময় দৃশ্য।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ : আহমদ রফিক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসমাইল সাদী। আলোচনায় অংশ নেন মোস্তফা তারিকুল আহসান এবং সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মনসুর মুসা।
বক্তারা বলেন, জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন বাংলাদেশের ভাষা ও সাহিত্য বিকাশে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে তিনি সংগঠকের ভূমিকায় সক্রিয় ছিলেন। সাহিত্য, গবেষণা ও ভাষা আন্দোলনভিত্তিক গ্রন্থ রচনায় তিনি শৈল্পিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অনন্য উদাহরণ রেখে গেছেন।
‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন আহমাদ মাযহার। বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কাজী বুশরা আহমেদ তিথি, ইশরাত শিউলি, জান্নাতুল ফেরদৌস মুক্তা ও নাসিম আহমেদ।
মেলায় নতুন বই এসেছে ৩৮টি : এদিকে গতকাল বইমেলায় নতুন প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩৮টি। তৃতীয় দিন শেষে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫৪টি। মেলায় আসা নতুন বইয়ের মধ্যে ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে জোবায়ের মিলন সম্পাদিত ‘আমাদের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী’, অনুপ্রাণন প্রকাশ করেছে মঞ্জু সরকারের গল্পগ্রন্থ ‘শখের বাগানে সাপ’, আখতার হুসেনের অনুবাদ ও সম্পাদনায় ‘জার্মানির রূপকথা’ প্রকাশ করেছে কথা প্রকাশ।
আজ রবিবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং শেষ হবে রাত ৯টায়। বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ : হামিদুজ্জামান খান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন নাসিমুল খবির, আলোচনায় অংশ নেবেন আইভি জামান এবং সভাপতিত্ব করবেন লালারুখ সেলিম। বিকেল ৪টায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।