প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ইফতার মাহফিল

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এনসিপির

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৫ এএম

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানম-ির আবাহনী মাঠে প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘দেশ যাবে নতুন পথে, ফিরবে না আর ফ্যাসিবাদে’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত ইফতার মাহফিল থেকে দলটির শীর্ষ নেতারা বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের পথচলাকে টেকসই করতে বিচার, সংস্কার ও গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ফ্যাসিবাদ ফেরার পথ রুদ্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন নেতারা।

অনুষ্ঠানে দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলপর্যায়ের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা, আহত জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী এবং দেশের বিভিন্ন জেলা কমিটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে দলের আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ফ্যাসিবাদ বিলোপে গণহত্যার বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণহত্যা, গুম ও খুনের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবিতে এনসিপি সোচ্চার রয়েছে এবং থাকবে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, এক বছরে এনসিপি নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। শুধু এনসিপি নয়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুরো বাংলাদেশই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছে। সে সময়কে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে যে নেতৃত্ব প্রয়োজন, এনসিপি তার অবস্থান থেকে সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আরেকটি মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘বিপ্লব, বিকল্প ও বিনির্মাণ’। তার ভাষায়, বিপ্লবের শক্তি থেকেই বিকল্প নেতৃত্বের জন্ম হয়েছে, যা বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চায়। নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, দেশ ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে বেরিয়ে এসেছে; এখন লক্ষ্য গণতন্ত্রকে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় কার্যকর করার আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

দলটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতার কথা উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকেই ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এনসিপির জন্ম; গণঅভ্যুত্থানই তাদের শেকড়।

আগামী কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশা জানিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তৃণমূল সংগঠনকে শক্তিশালী করে রাজনৈতিক অর্জন বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ নির্বাচনে ছয়টি আসনে বিজয় অর্জন করলেও দলটি এতে সন্তুষ্ট নয়; ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। পাশাপাশি সংস্কার পরিষদ গঠন এবং অন্তর্র্বর্তী সরকারের জারি করা আইন ও অধ্যাদেশগুলো সংসদে অনুমোদনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। বক্তব্যের শেষে নির্বাচনে সমর্থন দেওয়া সাধারণ ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ১০ দিনব্যাপী কর্মসূচিও ঘোষণা করে এনসিপি। কর্মসূচি অনুযায়ী ২ মার্চ চট্টগ্রাম, ৩ মার্চ কুমিল্লা, ৪ মার্চ সিলেট, ৫ মার্চ ময়মনসিংহ, ৬ মার্চ ঢাকা, ৭ মার্চ ফরিদপুর, ৮ মার্চ বরিশাল, ৯ মার্চ খুলনা, ১০ মার্চ রাজশাহী, ১১ মার্চ রংপুর, ১২ মার্চ ঢাকা মহানগর, ১৩ মার্চ ঢাকা মহানগর উত্তর, ১৪ মার্চ ঢাকা মহানগর দক্ষিণে বিভাগীয় ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

সংসদ হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা তর্ক-বিতর্ক থাকলেও জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জাতীয় সংসদই হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে তর্ক-বিতর্ক ও বহুমতের মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য গড়ে তোলা হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, গণতন্ত্রের মাঠে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান দেশের রাজনীতিকে আরও গতিশীল ও সমৃদ্ধ করবে। তরুণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে মর্যাদাবান করবে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় সংসদে এনসিপির ছয়টি আসন পাওয়া দলটির জন্য বড় অর্জন। তবে রাজনীতিতে সাফল্য রাতারাতি আসে না; উত্থানপতন মেনে নিয়েই এগোতে হয়। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মসূচি, গঠনতন্ত্র ও ইশতেহারে পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সড়ক পরিবহন, রেল ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে এনসিপির প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। গণভোটের প্রতিটি বাক্যের প্রতি জনগণের যে সমর্থন, তার কোনো অংশ সরকারের বাদ দেওয়া উচিত হবে না।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব। উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

এদিন এনসিপির গত এক বছরের কার্যক্রম নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র ও চিত্রপ্রদর্শনী হয়। জুলাই আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা, সংস্কার কমিশনে ভূমিকা এবং জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ দলটির পথচলার বিভিন্ন দিক এতে তুলে ধরা হয়।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নেতারা ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন এবং ঐক্যবদ্ধভাবে গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত