হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি ও ভূ-রাজনীতির স্পন্দনবিন্দু, যেখানে সরু এক জলপথে প্রতিদিন নির্ধারিত হয় বৈশ্বিক অর্থনীতি, শক্তির ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ। এ বিষয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
ভৌগোলিক মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এক চিলতে জলপথ যা দৈর্ঘ্যে খুব বেশি না হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি হলো হরমুজ প্রণালি (স্ট্রেট অব হরমুজ)। এটি কেবল পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে তা নয়, বরং এটি আধুনিক সভ্যতার জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান ফটক। এর উত্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইরান, আর দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই সংকীর্ণ জলপথের সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া, অথচ এইটুকু জায়গার ওপর দিয়েই আবর্তিত হয় বিশ্বের ভূ-রাজনীতি। একে যদি আমরা একটি ক্যানভাসে কল্পনা করি, তবে দেখা যাবে এটি একটি কাঁচির মতো আকৃতি ধারণ করে আছে, যা চাইলে যে কোনো মুহূর্তে বিশ্ব বাণিজ্যের সুতো কেটে দিতে পারে। এই জলপথটি এমন এক অবস্থানে রয়েছে যা ঐতিহাসিকভাবেই কৌশলগত কারণে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি চরম অনিশ্চয়তার দিকে মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এই অঞ্চলকে একটি বারুদ ঠাসা গুদামে পরিণত করেছে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলার প্রেক্ষাপটে সমুদ্র নিরাপত্তা ও মালবাহী জাহাজ চলাচলে অভূতপূর্ব ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইরান এবং পশ্চিমা শক্তির এই সরাসরি সংঘাত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক নৌ-সীমায় জাহাজগুলোর নিরাপত্তা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড ও নৌসেনার পক্ষ থেকে প্রকাশিত ভিএইচএফ (ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি) বেতার বার্তায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এই প্রণালি দিয়ে চলাচল না করার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক নৌ-আইন অনুযায়ী এই ধরনের বেতার বার্তা বাধ্যতামূলক কোনো ঘোষণা নয়, তবুও নিরাপত্তার খাতিরে অনেক বড় শিপিং কোম্পানি এবং ট্যাংকার মালিকরা তাদের ট্রানজিট স্থগিত করেছেন। অনেক জাহাজ এখন প্রণালিতে প্রবেশ না করে মাঝপথে অপেক্ষা করছে অথবা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিকল্প রুটে ফিরে যাচ্ছে। এই অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কতটা স্পর্শকাতর একটি বিষয়।
অর্থনীতির নাড়িস্পন্দন
কেন এই প্রণালিকে বিশ্বের জ্বালানি শিরা বলা হয়, তা এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তেলের পরিমাণ দেখলেই বোঝা যায়। প্রতিদিন বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত এবং কাতারের মতো দেশগুলোর অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। কোনো কারণে যদি এখানে একটি বড় ধরনের বিঘœ ঘটে, তবে টোকিও থেকে লন্ডন সবখানে হাহাকার পড়ে যাবে। এটি কেবল একটি ট্রানজিট রুট নয়, বরং এটি বিশ্বঅর্থনীতির এমন এক নিয়ন্ত্রক যা মুহূর্তের মধ্যে তেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি আসলে আধুনিক বিশ্বের প্রাণভোমরা, যা বন্দি হয়ে আছে পারস্য উপসাগরের দুই তীরের ক্ষমতার লড়াইয়ের মাঝে। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো তাই সব সময় এই জলপথের দিকে তীক্ষè নজর রাখে, কারণ এখান থেকে সরবরাহ বন্ধ হওয়া মানে বৈশ্বিক শিল্পায়নের চাকায় মরচে ধরা।
অস্থিরতার অগ্নিকুণ্ড
হরমুজ প্রণালির জলরাশি যতটা শান্ত দেখায়, এর নিচে ততটাই সামরিক অস্থিরতা বিদ্যমান। ইরান বারবার হুমকি দিয়েছে যে, তাদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণœ হলে তারা এই প্রণালি বন্ধ করে দেবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফিফথ ফ্লিট (পঞ্চম নৌবহর) এর সদর দপ্তর বাহরাইনে অবস্থিত হওয়ায় তারা এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। এই ইঁদুর-বেড়াল খেলা দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে। কখনো তেল ট্যাংকার জব্দ করা, কখনো ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি, আবার কখনো সমুদ্রসীমায় টহল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। এই সামরিকীকরণ প্রণালিটিকে একটি স্থায়ী রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে, যেখানে সামান্য একটি ভুল পদক্ষেপ বা ভুল বোঝাবুঝি থেকে শুরু হতে পারে মহাপ্রলয়। এখানে ইরান যেমন তার ভৌগোলিক সুবিধা ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তেমনি পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য
যুদ্ধের দামামা
এই প্রণালিটি আগেও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সাক্ষী হয়েছে। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় শুরু হয়েছিল কুখ্যাত ট্যাংকার যুদ্ধ। তখন দুই দেশই একে অপরের তেলবাহী জাহাজের ওপর হামলা চালাত যাতে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া যায়। সেই সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এই রুটে হামলার ঘটনা কমেনি। ২০১৯ ও ২০২০ সালে ওমান উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণ এবং পরে ড্রোন হামলার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ইতিহাস বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে। এই ঘটনাগুলো কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং বিশ্বকে এই বার্তা দেওয়া যে, হরমুজ প্রণালির চাবিকাঠি কার হাতে। ইতিহাসের এই বাঁকগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই জলপথটি কখনোই রাজনীতির ঊর্ধ্বে ছিল না এবং এর শান্ত নীল পানির নিচে সবসময়ই একটি আগ্নেয়গিরি সুপ্ত অবস্থায় থাকে।
যদি রুদ্ধ হয় দুয়ার
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি সত্যিই কোনোদিন হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তবে কী ঘটবে? উত্তরটি অত্যন্ত ভয়াবহ। একে বলা যেতে পারে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পতন। প্রণালি বন্ধ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা প্রতিটি দেশের উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয়কে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে। বাংলাদেশ বা ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা মারাত্মক সংকটে পড়বে। মুদ্রাস্ফীতি এবং লোডশেডিংয়ের মতো সমস্যায় জনজীবন স্থবির হয়ে যাবে। ইউরোপ ও এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশগুলোর কলকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া মানে হলো বিশ্বঅর্থনীতির ধমনিতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া। এটি কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট থাকবে না, বরং তা একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকটে রূপ নেবে। খাদ্যদ্রব্যের দাম থেকে শুরু করে ওষুধের দাম সবকিছুর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।
পরিবেশগত ঝুঁকি
এত সব রাজনীতির আড়ালে যে বিষয়টি আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই, তা হলো পরিবেশগত ঝুঁকি। অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি এবং বিশাল বিশাল তেলের ট্যাংকার চলাচলের ফলে এখানকার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে। যদি কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষের ফলে একটি সুপারট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং লাখ লাখ ব্যারেল তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা হবে একটি পরিবেশগত মহাবিপর্যয়। এই অঞ্চলের প্রবাল প্রাচীর, মাছ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্তির পথে চলে যাবে। সমুদ্রের পানির দূষণ কেবল সামুদ্রিক জীবনকেই নয়, বরং উপকূলীয় দেশগুলোর সুপেয় পানির উৎসকেও অকেজো করে দিতে পারে, কারণ এই অঞ্চলের অনেক দেশই সমুদ্রের পানি শোধন করে পানীয় জলের চাহিদা মেটায়। তেলের কালো ছায়া তখন কেবল অর্থনীতিতে নয়, নীল সমুদ্রের বুকেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করবে যা শত বছরেও মেরামত করা সম্ভব হবে না।
অনিশ্চয়তা ও বিকল্পের সন্ধান
বিশ্ব কি তবে চিরকাল এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবে? বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু দেশ বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কিছু পাইপলাইন তৈরি করেছে যা সরাসরি লোহিত সাগর বা ভারত মহাসাগরে গিয়ে মিশেছে, যাতে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানি করা যায়। কিন্তু সত্য এটাই যে, এই পাইপলাইনগুলো কখনোই হরমুজ প্রণালির বিশাল সক্ষমতার পূর্ণ বিকল্প হতে পারবে না। এখানে জ্বালানি বহুমুখীকরণের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্ব যত দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকবে, এই ধরনের সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরতা তত কমবে। তবে যতদিন পর্যন্ত খনিজ তেল আমাদের শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে থাকবে, ততদিন হরমুজ প্রণালি হবে ভূ-রাজনীতির শ্রেষ্ঠ মঞ্চ। বড় দেশগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই এই প্রণালিকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে উত্তপ্ত করে রাখবে।
আইন ও আধিপত্য
হরমুজ প্রণালি কেবল একটি আঞ্চলিক জলপথ নয়; এটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ হিসেবে স্বীকৃত। অর্থাৎ, এটি এমন একটি প্রণালি যা দুটি উন্মুক্ত সমুদ্রাঞ্চলকে সংযুক্ত করে এবং যার ওপর দিয়ে বিশ্বের বহু দেশের বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ নিয়মিত চলাচল করে। ফলে এখানে কেবল ভৌগোলিক অবস্থান নয়, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই প্রণালির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক কাঠামো হলো জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সনদ, যা সাধারণভাবে ‘আনক্লস’ নামে পরিচিত। ১৯৮২ সালে প্রণীত এই সনদে বিশ্বের সমুদ্রসীমা, আঞ্চলিক জলসীমা, একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক প্রণালিসমূহে জাহাজ চলাচলের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বা অবাধ পারগমন নীতি। এই নীতির অধীনে আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে সব দেশের জাহাজ বাণিজ্যিক কিংবা সামরিক নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুতগতিতে পারাপারের অধিকার রাখে। উপকূলবর্তী রাষ্ট্র চাইলে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত কারণে কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সীমিত।
এখানেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত। ইরান আনক্লস সনদে স্বাক্ষর করলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুমোদন করেনি। ইরানের অবস্থান হলো তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌম স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজে আনক্লস অনুমোদন না করলেও বাস্তবে ট্রানজিট প্যাসেজ নীতিকে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন হিসেবে মেনে চলে এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নেয়।
