আলুর দামে কৃষকের কপালে হাত

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০১:০৭ এএম

ধান ও আমের পাশাপাশি সবজি উৎপাদনে দেশের অন্যতম জেলা হিসেবে পরিচিত নওগাঁ। গত বছর আলু চাষ করে লোকসান গুনলেও এবার ভালো দাম পাবেন এমন আশা নিয়ে আলু চাষ করেছিলেন নওগাঁর চাষিরা। তবে মৌসুমের শুরুতেই বাজারে আলুর দরপতনে নওগাঁর আলুচাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। দরপতনের কারণে উৎপাদন উঠাতে পারছেন না চাষিরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষকের মুখের হাসি উধাও হয়ে গেছে।

গত বুধবার নওগাঁয় বিভিন্ন মাঠ ঘুরে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। বদলগাছী উপজেলার সোমবারী গ্রামে শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে ক্ষেত থেকে আলু তুলছিলেন আমজাদ হোসেন। গত বছর আলু চাষ করে লোকসান গুনতে হয়েছিল তার। তাই এবার ঝুঁকি এড়াতে জমি কমিয়েছেন। ছয় বিঘা জমিতে আলু লাগিয়েছেন এবার। ইতিমধ্যে ২৫০ মণ আলু মাঠ থেকে তুলেছেন। বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে দাম না পেয়ে হতাশ তিনি।

আমজাদ বলেন, ‘গত বছর ১০ বিঘা জমিতে আলু লাগিয়ে বিঘাপ্রতি ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা লোকসান গুনেছি। এবার জমি কমায়ে ৬ বিঘা জমিত আলু লাগাইছি। ভাবছি, গতবার বাজার মন্দা গেছে এবার মনে হয় দাম পামু। কিন্তু এবার শুরুতেই বাজার মন্দা। গত বছর এ সময়ে স্টিক (গ্রানুলা) আলু ২০-২২ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করিছি। এবার তো ৭-৮ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হচ্ছে। বাড়িত আলু সংরক্ষণ করার জায়গা নাই। হিমাগারেও আলু লিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে জমিত থ্যাকে একটু একটু করে আলু তোলিছি আর বিক্রি করিছি।’

আমজাদ হোসেনের মতো আলু চাষ করে হতাশ জেলার মান্দা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের আলু চাষি মোত্তালেব হোসেন। তিনি বলেন, ‘দুই বছর ধরে আলু চাষ করে ধরা খাচ্ছি। গত বছর হিমাগারে ১২০ বস্তা আলু রাখছিলাম। সেই আলুতে বস্তাপ্রতি ৬০০ থেকে ৬৫০ লোকসান হইছি। এবার তো আরও দাম কম। জমিত থেকে আলু বাড়িতেই ঘরের মধ্যে স্তূপ করে রাখতেছি আর একটু একটু করে বিক্রি করতেছি। হিমাগারে রাখলে গতবারের মতো বড় লোকসান হতে পারে এই ভয়ে হিমাগারে আলু রাখতে যাইনি।’

মান্দার ফেটগ্রামের কৃষক রাশেদ হাসান বলেন, এবার এক একরে আলু চাষ করেছেন। আলু উত্তোলনের পর এখনো দাম না থাকায় বিক্রি ও রাখার জায়গা সংকটে হিমাগারে সংরক্ষণ করতে পারেননি। সেই আলু মাঠে নিয়ে বিপাকে তিনি। তিনি বলেন, ‘বাজারে আলুর দাম নাই, হিমাগারোত জায়গা নাই। বাধ্য হয়ে জমিত আলু তোলে জমিতেই স্তূপ করে রাখিছি। পরপর দুই বছর আলু আবাদ করে ধরা খাইলাম। মানুষ আবাদ করে একটু লাভের আশায়। লাভ তো দূর থাক, খরচই উঠেছে না।’

ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই নওগাঁর মাঠে মাঠে আলু তোলার ধুম পড়েছে। প্রতি শতকে বিভিন্ন প্রকার আলু চার থেকে সাড়ে মণ করে উৎপাদন হচ্ছে। চাষিরা বলছেন, দিন যতই যাচ্ছে, বাজারে আলুর দাম ততই কমছে। হিমাগারগুলোতে গতবারের আলু এখনো মজুদ থাকায় নতুন আলু নেওয়া হচ্ছে না। ফলে কৃষকরা আলু সংরক্ষণও করতে পারছেন না। বর্তমান বাজার অনুযায়ী আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ দূরের কথা, বিঘাপ্রতি বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। ফলন ভালো হলেও দামের অস্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তিত কৃষি বিভাগও।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁ কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলায় ২১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। ১১ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলু আবাদ হয়েছে মান্দায় ৩ হাজার ৯৪০ হেক্টর। এরপরই বেশি আলুর আবাদ হয়েছে বদলগাছী উপজেলায় ৩ হাজার ৬০ হেক্টর। জেলায় এ বছর গ্রানুলা, কারেস, রোমানা, কার্ডিনাল, দেশিসহ বিভিন্ন জাতের আলু চাষ হয়েছে।

কৃষকদের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষে সার, বীজ, সেচ, নিড়ানি ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে যে বাজারদর তাতে প্রতি বিঘার আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫-১৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিঘাপ্রতি তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে ১৪-১৫ হাজার টাকার।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁর উপ-পরিচালক হুমায়রা ম-ল বলেন,  গত বছর আলুর বাজার মন্দা যাওয়ায় এবার আমরা কৃষকদের আলু চাষে নিরুৎসাহিত করেছিলাম। তারপরও অনেক কৃষক ঝুঁকি নিয়ে আলু আবাদ করেছেন। এখন যেহেতু বাজারে আলুর দাম কম এবং হিমাগারেও আলু সংরক্ষণ করতে পারছেন না, সেজন্য কৃষকদের আমরা বাড়িতেই বিশেষ কৌশলে আলু সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিচ্ছি। আলু জমি থেকে তোলে সেগুলো গ্রেডিং (বড়-ছোট বাছাই) ও কিউরিং (ছায়াযুক্ত স্থানে বিছায়ে) করে আলুর ছালটা মোটা করে বাড়িতেই মাছান করে তার ওপর আলু সংরক্ষণ করলে অনেক দিন ভালো থাকে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত