পরীক্ষাটা রূপনার, অন্যদেরও

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০১:১৭ এএম

কদিন আগে বাংলাদেশ দলের একজন কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘পিটার বাটলারের এই দলে কেবলমাত্র একজনের একাদশে জায়গা সুনিশ্চিত। সে রূপনা চাকমা। তবে যদি বিকল্প থাকত কোচ রূপনাকেও বাদ দিয়ে দিতেন।’ এরপর কথাটার ব্যাখ্যা দিলেন সবিস্তারে, ‘দেখেন, রূপনার গোলকিপিং সেন্স যেমন, তা দিয়ে অনায়াসে এশিয়ার বড় দলে খেলে ফেলতে পারে। বাটলার তাই এই জায়গাটায় ভীষণ নিশ্চিন্ত। তবে রূপনার উচ্চতায় সমস্যা আছে। মেয়েটা যদি আরও একটু লম্বা হতো, বাটলার কখনই তার বিকল্প খুঁজতেন না। একটু খাটো বলেই মাঝে মধ্যে কোচ গোলকিপিং নিয়ে আফসোস করেন। তবে কখনই বড় ম্যাচে রূপনাকে ছাড়া একাদশ ভাবতে পারেন না।’

রবিবার জুবিলি স্টেডিয়ামে অনুশীলনের ফাঁকে কথা হয় দলের গোলকিপিং কোচ মাসুদ আহমেদ উজ্জ্বলের সঙ্গে। জাতীয় দলে রূপনার প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পেছনে যার অনেক অবদান। সেই ছোটবেলা থেকেই উজ্জ্বলের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে জাতীয় দলে অটোমেটিক চয়েজ রূপনা। তাই প্রিয় শিীষ্যকে নিয়ে গর্বের শেষ নেই উজ্জ্বলের। একই সঙ্গে অবশ্য আক্ষেপ আছে, রূপনার কাছাকাছি মানের করে কাউকে গড়ে তুলতে না পেরে। এশিয়ান কাপ অভিষেকের আগের দিন অবশ্য দলের তিন গোলকিপারে ভালো-মন্দের ব্যবচ্ছেদ করার পথে হাঁটেননি এই কোচ। বরং চীন পরীক্ষার আগে কথা বলেছেন তিনজনের প্রস্তুতি নিয়েই।

চীন এ আসরের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন, সবচেয়ে বেশিবার শিরোপা জয়ের গর্বও চীনাদের সঙ্গী। বি গ্রুপে তারপরও তারা ফেভারিট নয়। র‌্যাংকিংয়ের হিসেবে এই গ্রুপের ফেভারিট উত্তর কোরিয়া। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে নবম স্থানে থাকা উত্তর কোরিয়া এশিয়ায় আছে দুইয়ে, জাপানের ঠিক পরে। এ কারণেই কোরীয়দের মোকাবিলার আগে দুই ম্যাচে চীন চাইবে প্রথমত কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করতে। দ্বিতীয়ত বেশি বেশি গোল করে গ্রুপসেরা লড়াইয়ে এগিয়ে থাকতে। এ কারণেই শুরুর ম্যাচে বাংলাদেশকে কোনো ছাড় যে চীনারা দেবে না তার বলাই যায়। এখানেই রূপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই চ্যালেঞ্জটা জিততে হলে রূপনার একার লড়াই যথেষ্ট নয়। চীনকে রুখতে বাংলাদেশি রক্ষণভাগকে হয়ে উঠতে হবে চীনের প্রাচীরের মতো। আফঈদা খন্দকার, শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার সিনিয়র, কোহাতি কিসকুরা কতটা প্রতিরোধ গড়তে পারেন, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে রূপনাকে কতটা ঝড় ঠেকাতে হবে। উজ্জ্বলের বিশ্বাস, এতদিন রূপনারা যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন, যে দিকগুলো পুক্সক্ষানুপুঙ্খ রূপে কোচ হিসেবে বুঝিয়ে দিয়েছেন, দায়িত্বটা যেভাবে মাথায় গেঁথে দিয়েছেন রূপনা সেসব মেনে খেলতে পারলে গোল হজমের শঙ্কা অনেকটাই হ্রাস পাবে, ‘টেকনিক্যালি-টেকটিক্যালি যেই সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হই ওদের নিয়ে, ওগুলোর ওপরই জোর দিচ্ছি। ওরা যদি বেসিক জিনিসটা ঠিক রাখে, ভুল কম করবে। আমি ওদের কনফিডেন্সটা দিচ্ছি সারা বছর ধরে আমরা যেই জিনিসগুলো শিখেছি, ওই জিনিসগুলো যদি করতে পারি, তাহলে ভুলভ্রান্তি কম হবে। আর ভুলভ্রান্তি কম হলে গোল হজম করার সুযোগটা কমে আসবে।’

আসরের ড্রয়ের পর থেকেই প্রতিপক্ষ তিন দলকে নিয়ে হোমওয়ার্ক শুরু করেছে বাংলাদেশের কোচরা। চীনকে ভালোভাবে পড়াও হয়ে গেছে, দাবি উজ্জ্বলের। তবে এটাই যথেষ্ট নয়। চীনের গোল সুনামি ঠেকাতে নিজেদের সামর্থ্যরে বেশিটা নিংড়ে দিতে হবে গোটা দলকে, সে কথাটাই মনে করিয়ে দিলেন উজ্জ্বল, ‘প্রতিনিয়ত আমরা প্রতিপক্ষের ম্যাচ দেখছি। ওদের শক্তি-দুর্বলতা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। আজকের ট্রেনিং সেশনেও প্রত্যেকটা জোনে বা প্রত্যেকটা পজিশনে ইন্ডিভিজুয়ালি প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ের দায়িত্বগুলো আমরা বুঝানোর চেষ্টা করেছি। সবাই যদি নিজ নিজ দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করে, ভুল কম হয়, তবে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে আমরা বেঁচে যাব।’

রূপনার উচ্চতা একটা বড় মাথাব্যাথা। শারীরিক বাধাকে উতরে গিয়ে তিনি কতটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারেন, এটা নিয়েই কয়েক মাস ধরে কাজ করছেন উজ্জ্বল। তবে তাকে নিয়ে আলাদা করে কিছু বলেননি তিনি, ‘আসলে তিনজনকে নিয়েই আমি কাজ করছি। প্রতিপক্ষ দলের সবাই আমাদের চেয়ে শারীরিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে। হাওয়ায় ভাসা বলে যাতে তারা শারীরিক উচ্চতার সুবিধা বেশি কাজে লাগাতে না পারে, গোলকিপার হিসেবে সেই মুহূর্তে কী করতে হবে, সেগুলোই তাদের বারবার বোঝানো হয়েছে। এখন মাঠে পরিশ্রমের ছাপটা মিললেই হয়।’ কেবল রূপনা নয়, চীনকে থামাতে রক্ষণ থেকে শুরু করে ফরোয়ার্ড লাইন পর্যন্ত কার্যকর হতে হবে, মনে করেন দলের অন্যতম মিডফিল্ডার মনিকা চাকমা, ‘আমাদের গোলকিপার থেকে স্ট্রাইকার পর্যন্ত সবাইকেই শক্তিশালী হতে হবে। এ কারণে সব বিভাগেই আমাদের কাজ চলছে। আমরা ওদের (চীনের) সঙ্গে খেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ওদের মতো দলের সঙ্গে খেলার সুযোগ হয়েছে, আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাই। যার যে দায়িত্ব, সেটা পালন করে খেলার চেষ্টা করব।’

আজ ম্যাচ ভেন্যুতে প্রস্তুতির সুযোগ মিলছে না। তাই আগের দুদিনের মতো জুবিলি স্টেডিয়ামে শেষ প্রস্তুতি নেবে দল। অভিষেকটা স্মরণীয় করতে রূপনাসহ জ্বলতে হবে সবাইকে। উজ্জ্বলের কথায় তবেই থামানো যাবে বিপর্যয়। নইলে...।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত