আপাতত দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। জুন মাস পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তুতি রয়েছে সরকারের। এরপরও যুদ্ধের অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা ডিজেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। যদিও সরকারের এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের ওপর। প্রতিদিনই বাড়ছে দাম। বাড়ছে সংকটও। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে জ্বালানি নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের উদ্বেগ।
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান। তিনি আশ্বস্ত করেন, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ মজুদ রয়েছে, তাতে দাম বাড়ার শঙ্কা নেই। জ্বালানি সরবরাহে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন সরবরাহকারীরা। যুদ্ধ পরিস্থিতি নজরে রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।
নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে চলতি মাসে ১৪ থেকে ১৫টি কার্গোর এলসি দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এপ্রিলেও একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানির প্রস্তুতি রয়েছে। এর মধ্যে সোমবার পর্যন্ত সাতটি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে।
বিপিসির তথ্যমতে, বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার টন জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিন ও বিমানে ব্যবহৃত জ্বালানি জেড ফুয়েলের মজুদ রয়েছে ৩০ দিনের। এ ছাড়া ২০০ দিনের কেরোসিন আর ৪২ দিনের মেরিন ফুয়েল মজুদ আছে।
জ্বালানি বিভাগ ও বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, খুব বড় ধরনের বিপর্যয় না হলে আগামী মাস পর্যন্ত দেশে জ্বালানি সরবরাহের কোনো সমস্যা নেই। তবে এ ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেলে বিপিসির আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে।
‘উদ্বেগের কথা হলো যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে অতীতের মতো কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেলের অবৈধ মজুদ করে কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি করতে পারে। সেটি হলে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বেন কৃষকরা। এতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে’ এমন আশঙ্কা একাধিক কর্মকর্তার। এ ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
প্রতি বছর দেশে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করে বিপিসি। এর মধ্যে ৬৩.৪১ শতাংশ পরিবহন, ১৫.৪১ শতাংশ কৃষি, ৫.৯৬ শতাংশ শিল্প, ১১.৬৭ শতাংশ বিদ্যুৎ এবং গৃহস্থালি ও অন্যান্য খাতে ব্যবহৃত হয় অবশিষ্ট জ্বালানি। ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের মধ্যে ৬২.৬৯ শতাংশ ডিজেল, ১৪.৩৪ শতাংশ ফার্নেস অয়েল, ৬.৩২ শতাংশ পেট্রোল, ৫.৯০ শতাংশ অকটেন, ১ শতাংশ কেরোসিন, ৮.১৯ শতাংশ জেট ফুয়েল এবং ১.৫৬ শতাংশ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে।
মোট জ্বালানির বেশিরভাগই ডিজেল, যা ব্যবহৃত হয় কৃষি ও পরিবহন খাতে। পাশাপাশি বিদ্যুতেও অন্যান্য জ্বালানির পাশাপাশি এটি ব্যবহার হয়।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের মধ্যে ৮০ শতাংশই পরিশোধিত বা ডিজেল। পরিস্থিতি যাই হোক সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হবে না। বিকল্প নানান উপায় ও উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দাম বাড়লে এর ব্যয় সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
‘আমার ধারণা দুই সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এলএনজি নিয়ে কিছুটা সংকটের আশঙ্কা থাকলেও জ্বালানি তেল নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা দেখছি না আপাতত’ যোগ করেন তিনি।
ড. ইজাজ বলেন, সরকারি নিয়ন্ত্রণে পেট্রোলপাম্প মালিকদের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ করায় এ ক্ষেত্রে কারসাজি করার তেমন একটা সুযোগ নেই। তবে খুচরা ডিজেল বিক্রেতারা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বাড়তি দাম নিতে পারে তেমন আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য সরকারকে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়াতে জ্বালানির মুজদ সক্ষমতা তিন মাসে উন্নীত করার পরামর্শ দিয়েছেন এ বিশেষজ্ঞ।
এদিকে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে আগের চেয়ে ১০ শতাংশ বেড়ে ৮২ মার্কিন ডলারের ওপরে উঠে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সারা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল-গ্যাস ওই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। দেশটির দক্ষিণে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ওই জলপথ দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করেছে তেহরান। এতে ওই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তেলের বাজারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
গ্যাস সরবরাহে সংকটের আশঙ্কা : জ্বালানি তেল নিয়ে এই মুহূর্তে সংকট না থাকলেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই উদ্বেগের মূল কারণ হলো দেশে এলএনজি মুজদের অবকাঠামো নেই। আবার কাতার এলএনজি উৎপাদন স্থগিত করেছে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাবেও সংকট তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। কাতারের প্রধান গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে হামলার পর গত সোমবার সাময়িকভাবে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে কাতার।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস কমপ্লেক্স রাস লাফানে ১৪টি এলএনজি ‘ট্রেন’ পরিচালিত হয়, যার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৭ কোটি ৭০ লাখ টন। এ বিপুল সক্ষমতার কারণেই কাতার বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে উৎপাদন বন্ধের ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
কাতারের এ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছে আমদানিনির্ভর দেশগুলো। তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে ঝুঁকির তালিকায়। দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে ওঠানামা করে। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুটই আসে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বছরে ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে ১১৫টি কার্গোর মাধ্যমে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ৪০ লাখ টন সরবরাহ করে কাতার। বাকি বড় অংশ আসে ওমান থেকে, সেটিও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। পাশাপাশি চাহিদা মেটাতে খোলাবাজার থেকেও এলএনজি কেনা হয়, যেখানে দাম তুলনামূলক বেশি এবং অস্থির।
বর্তমানে মহেশখালীতে স্থাপিত দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে আসা কার্গো থেকে এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। চলতি মার্চে ১১টি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি ইতিমধ্যে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এলাকা এড়িয়ে নিরাপদে গন্তব্য অতিক্রম করেছে।
জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো একটি কার্গোর সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে দেশে গ্যাস সংকট দ্রুত তীব্র আকার নিতে পারে। কারণ, পাইপলাইনের দেশীয় গ্যাস উৎপাদন আগের তুলনায় কম। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে স্বল্পচাপের সমস্যা প্রকট হয়েছে। বহু এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আমদানি করা যেসব কার্গো ১৫ তারিখের মধ্যে আসার কথা সেগুলো ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ১৫ থেকে ১৮ তারিখের মধ্যে এক-দুটি কার্গো নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমরা সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি কীভাবে বিকল্প উপায়ে এলএনজি আমদানি করা যায়।’
‘চলতি মাসে খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানির কোনো পরিকল্পনা নেই। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তখন এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানি বা বিকল্প উপায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে’ বলেন তিনি।
তাৎক্ষণিক সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে দামের চাপ। দেশের মোট জ্বালানির বড় অংশ আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই বাড়ে আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার বাড়লে বছরে অতিরিক্ত কয়েক হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হয়। এ অবস্থায় এলসি খোলা কঠিন হওয়ার পাশাপাশি অস্থিরতা বাড়তে পারে ডলারের বাজারে। সঙ্গে বাড়তে পারে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও বড় ঝুঁকি হচ্ছে দামের ধাক্কা। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া ও বাজেট ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাড়তে পারে ব্যয় : গত বছর এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বৈশ্বিক বাজারে দাম বাড়লে এ ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে একদিকে বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে ভর্তুকি বাড়ানো না হলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে মূল্য সমন্বয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাতারে উৎপাদন বন্ধ দীর্ঘায়িত হলে স্পট বাজার থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হবে বাংলাদেশ। এতে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।
এলএনজির দাম বাড়লে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যেতে পারে। তখন তুলনামূলক ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ বাড়াতে হবে, যা উৎপাদন খরচ বাড়াবে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে গ্রাহক পর্যায়ের বিদ্যুতের দামে।
পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এতে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মতো জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।
