ঘোষণা ছাড়াই হাসপাতাল পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

অসংগতিতে অসন্তোষ, ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম

স্বাস্থ্যমন্ত্রী পরিদর্শনে গেলে আগে থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। মন্ত্রীকে বরণে চলে ব্যাপক প্রস্তুতি। সব পরিচ্ছন্ন পরিপাটি করে রাখা হয়। কখনো আবার বিছানো হয় সুন্দর গালিচা। ফুল নিয়ে দুই পাশে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীকে বরণে থাকে নানা প্রস্তুতি। অপেক্ষায় থকেন সাংবাদিকরা। কিন্তু না। এবার একটু ব্যতিক্রম হলো। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালে গেলেন কিন্তু কেউ জানতে পারলেন না। তিনি হাসপাতালে পৌঁছার পর তার জনসংযোগ দপ্তর থেকে সাংবাদিকদের খুদে বার্তায় জানানো হয়, মন্ত্রী অমুক হাসপাতালে গেছেন, কাছাকাছি কেউ থাকলে চলে আসার অনুরোধ। মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার ১২-১৩ দিন পর থেকে সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করছেন। কোথাও কোনো অসংগতি দেখলে অসন্তোষ প্রকাশ করে তাৎক্ষণিক তা সমাধানে নির্দেশ দিচ্ছেন। গত মঙ্গলবার রাতে মহাখালী সংক্রামক হাসপাতালে যান তিনি। গতকাল বুধবার সকালে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ লেখালেখি করছে। কেউ কেউ লিখছেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না নিলে হাসপাতালে পরিবেশ ভালো হবে না।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদলের সাংগঠিক সম্পাদক মো. আমানউল্লাহ আমান লেখেন, ‘বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র আমাকে প্রচন্ড  পীড়া দেয়। আমি প্রায়শই সহযোদ্ধা-কর্মী, পরিচিত স্বজন যে কারও অসুস্থতার কথা শুনলে হাসপাতালে ছুটে যাই। যতবার  হাসপাতালে যাই বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ দেখলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। হাসপাতালগুলোর পরিবেশ দেখলে মনে হয় সুস্থ মানুষ কিছুক্ষণ থাকলে অসুস্থ হয়ে যাবে। এখানে আমি শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দোষ দিচ্ছি না, জনবিস্ফোরণের এই দেশে আসন সংখ্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা যে অনেক বেশি সেটা তো দৃশ্যমান। কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রে আপনাদের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। আমাদের অনেক সরকারি হাসপাতালে ঢুকলেই সিম্পলি বমি এসে যায় গন্ধে! এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’

বিএনপি সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করে। পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন সরকার কার্যক্রম শুরু করে। এরপর বেশ কিছু জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ১ মার্চ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশে তাকে অপারেশন করার কথা বললেও তিনি ভারতের বেঙ্গালুরে গিয়ে অপারেশন ছাড়াই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন।

 গত মঙ্গলবার রাত ৮টা ৫০ মিনিটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান এক খুদে বার্তা পাঠান। বার্তা ছিল এমন ‘জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সংকট উত্তরণে খোঁজখবর নিতে মহাখালী সংক্রামক হাসপাতালে গিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী। মিডিয়া প্রতিনিধি কেউ কাছাকাছি দূরত্বে এভেইলেবল থাকলে যাওয়ার আমন্ত্রণ রইল।’ তিনি সেখানে পরিদর্শন শেষে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সংকট সমাধানের নির্দেশ দেন।

রাত ১১টা ১৫ মিনিটে আরেক খুদে বার্তায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান জানান, ৪ মার্চ সকালে সাড়ে ৯টার দিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সচিবালয় থেকে কাছাকাছি কোনো হাসপাতালে সারপ্রাইজ ভিজিটে যাবেন। এরপর গতকাল সকাল ৯টা ১৮ মিনিটে তিনি জানান, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢাকা মেডিকেলে আছেন। আগ্রহীরা আসতে পারেন। বেশ কিছুক্ষণ থাকবেন।’

ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বেশ কিছু অসংগতি দেখতে পান। পরিদর্শন শেষে তিনি নানা বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। মন্ত্রী জানান, কাঠামোগত দিক থেকে ওটিগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলেও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বেশিরভাগ ওটির মান উন্নয়নের প্রয়োজন আছে। একটি মাত্র ওটি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তুলনীয়, এমনটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে সব ওটি আধুনিকায়ন করা হবে, যাতে রোগীরা উন্নত পরিবেশে অস্ত্রোপচার সেবা পান।

মন্ত্রী বলেন, প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার অতিরিক্ত রোগী সেবা নিতে আসেন। অনেক সময় একই বেডে দুই থেকে তিনজন রোগী রাখতে হচ্ছে। চিকিৎসকের তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি, অ্যানেস্থেলজিস্ট ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীসহ সহায়ক জনবল কম, এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই চিকিৎসক-নার্সরা দিনরাত কাজ করছেন। তিনি জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত চাপ, জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেবার মানোন্নয়নে কাজ চলছে।

হাসপাতালের লন্ড্রি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নিজস্ব ওয়াশিং প্ল্যান্ট না থাকায় চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় কাপড় ধোয়ানো হয়, যেখানে মান বজায় না রাখার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে পরিচালককে ঠিকাদারদের বিল কর্তন ও কঠোর তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী।

হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা অবাধ যাতায়াত ও অতিরিক্ত উপস্থিতির কারণে পরিচ্ছন্নতা বিঘিœত হচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, নির্দিষ্ট সময়সূচি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শৃঙ্খলা আনা হবে। দেশের হাসপাতালগুলোর মানোন্নয়নে আমাদের সবাইকে ডিসিপ্লিন মানতে হবে।

দালালচক্রের অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, রোগী ভর্তিতে অর্থ আদায়, ট্রলি বেচাকেনা বা রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার মতো কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নেব। এ সময় তিনি জানান, শুধু ঢামেক নয়, সারা দেশে জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ট্রমা সেন্টারসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে বড় পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রামের মানুষ যাতে নিজ জেলা পর্যায়েই চিকিৎসা পায়, সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। এতে রাজধানীকেন্দ্রিক চাপ কমবে।

খাবারের মান সম্পর্কে তিনি বলেন, রোগীদের জন্য সকালের নাশতা ও দুপুরের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে; পচা বা অখাদ্য খাবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তিনি পাননি।

দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১২-১৩ দিনের মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন শুরু করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও সরকারের নির্দেশনায় স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তারা বদ্ধপরিকর। এ জন্য সাংবাদিক ও জনসাধারণের সহযোগিতা দরকার।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রী এভাবে আকস্মিক বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনে যাবেন। কোথায় কী অসংগতি আছে তা তিনি নিজে চোখে দেখতে চান এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেই ভাবে ব্যবস্থা নিতে চান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে আস্থা নিয়ে তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি সেই আস্থা রাখতে চান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত