শিক্ষার মূল সমস্যা কী

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৪ এএম

শিক্ষায় হাজারো সমস্যার মধ্যে আমাদের মূল সমস্যাগুলোতে হাত দিতে হবে। বিরাট অংশের শিক্ষার্থীরা নিজ ক্লাসে বাংলায় লেখা বইগুলো দেখে পড়তে পারে না, আরও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী নিজ শ্রেণির ইংরেজি দেখে পড়তে পারে না এই চিত্র শুধু গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নয়, হরহামেশা চোখে পড়ে ঢাকা শহরেও। বছরখানেক আগে সহকর্মী গৌতম রায়, জানাশোনা ইংরেজির শিক্ষক, বহু বছর এনসিটিবিতে কর্মরত ছিলেন। চাকরির শেষের দিকে কবি নজরুল কলেজে বদলি হলেন। একদিন ক্লাসে গিয়ে দু-একজন শিক্ষার্থীকে ইংরেজি বই পড়তে বললেন। উনি দেখলেন, তারা বই দেখে পড়তে পারছে না। উনি বহু বছর পর শিক্ষকতায় গিয়ে অবাক হয়েছিলেন। আমি ঢাকার কিছু স্কুল ও কলেজের চিত্র সম্পর্কে জেনেছি এবং দেখেছি শিক্ষার্থীদের। কিন্তু অবস্থা একই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের আরও করুণ অবস্থা। শিক্ষার্থীরা বই দেখে কেন পড়তে পারে না? তাদের পড়ার অভ্যাস নেই, পড়ার প্রয়োজনও হয় না, কোনো দিক থেকে পড়ার তাগিদও আসে না না বাসা, না শ্রেণিকক্ষ, না কোচিং সেন্টার। তাদের পড়ার দরকারই হয় না। নামি-দামি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি থাকে বলে, কখনো কেউ বই পড়তে পারে কিনা তা দেখার সময় পান না শিক্ষক, ডিসিপ্লিন রক্ষা, রোল কল করা আর কিছু পড়ানো বা বুঝানো। এর ফাঁকে ফাঁকে ‘চিৎকার’ করে শিক্ষার্থীদের থামতে বলার মধ্যেই ক্লাস শেষ। কে কী বুঝল, সেটি শিক্ষকের দেখার সময় ও সুযোগ হয় না বাস্তব কারণে। এ ঘটনা অধিকাংশ নামি-দামি প্রতিষ্ঠানে ঘটে থাকে। একজন শিক্ষার্থী যদি ভালোভাবে বই পড়তেই না পারে, তাহলে সে কীভাবে ভেতরের মেসেজ বুঝবে? প্রতিটি বিষয়ের তথ্য ও ধারণা শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য উৎস থেকে আহরণ করতে হয়। কিন্তু তাদের পড়ার আগ্রহ ও তাগিদ না থাকায়, তারা তা করে না।

আমাদের চিন্তা, গবেষণা আর আলোচনার বিশাল অংশ জুড়ে থাকে অ্যাসেসমেন্ট! কিন্তু অ্যাসেসটা করব কী? বিষয় যাই হোক, খাতা না দেখে, না পড়ে নম্বর দেওয়ার ট্রাডিশন শুরু হয়েছে কয়েক দশক ধরে। কারণ খাতা পড়লে বা শিক্ষার্থীরা কি লিখেছে তা পড়লে, পাসের হার বিশের নিচে চলে আসবে। সেই চিত্র সংশ্লিষ্ট কেউ দেখতে চায় না বলে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য, সহানুভূতির সঙ্গে খাতা দেখে ‘খয়রাতির’ পাস করাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এ কারণে শিক্ষকরাও পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। কারণ তারা পড়াশোনা না করিয়েই ক্লাস করাতে পারেন, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা বা জানার আগ্রহ হারিয়ে গেছে বহু আগে। এই সমস্যাগুলোতে হাত না দিয়ে, আমরা সবাই কারিকুলামের দোষ দিই। কারিকুলাম কী করেছে? আমরা বহু অর্থ ও সময় ব্যয় করে কারিকুলাম তৈরি করি। কিন্তু কারিকুলাম থাকে কারিকুলামের জায়গায় আর শিক্ষার্থীরা থাকে তাদের জায়গায়। মাঝখানে বিশাল শূন্যতা, বিশাল গ্যাপ। কে পূরণ করবে সেই গ্যাপ? শরীরের পুষ্টির জন্য সুষম খাবার দরকার, সেই সুষম খাবার একেক অঞ্চলের মানুষের একেক ধরনের। বাঙালির সুষম খাদ্য হলো ভাত, মাছ, শাকসবজি। নরওয়ে শীতপ্রধান দেশ, নেদারল্যান্ডস শীতপ্রধান ও উন্নত দেশ, সেখানকার সুষম খাবার আমাদের রুচিতে ধরবে না, আমাদের শরীর ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাবে না। পূর্ববতী সরকার ভিনদেশি সুষম ও পুষ্টিকর খাবার বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের খাওয়াতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটি কোনোভাবে এ দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য খাবার হবে না এবং হয়নি। তারা একটি সিটির সব দালানকোঠা ভেঙে চুরমার করে সব পরিবর্তন করতে চেয়েছিল।

শিক্ষকরা ক্লাসে না থাকলে শিক্ষার্থীরাও থাকবে না। থাকেওনি। সবাইকে বের করে সব কিছু তছনছ করে সেই ২০১৯ সাল থেকে শুরু করে বৃহৎ পরিবর্তনের বয়ান এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেই নিয়ে বিভিন্ন খেলায় মেতেছিল। ফলে না পড়া শিক্ষার্থীরা ঢোলের বারি শুনে বই পুস্তকের সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তাদের কোনো ধরনের পরীক্ষায় বসতে হবে না, তারা আনন্দের মাধ্যমে শিখবে! সেই আনন্দ করতে গিয়ে না পড়া শিক্ষার্থীরা এখন আর পড়তে পারে না। বোর্ড পরীক্ষায় খাতা দাগাদাগি করে এলেও পাস, বাংলা খাতায় কৃষিবিজ্ঞান লেখলেও পাস। অতএব তারা পড়বে কেন? পরিবর্তন দরকার এসব ক্ষেত্রে। কারিকুলামের দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারিকুলাম যা আছে, সেটি যদি শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো পড়ানো যায় তাহলেই তারা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। কারিকুলাম পরিবর্তনের নামে বছরের পর বছর সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের এক সাসপেন্সের মধ্যে রেখে কোনো কূলকিনারা করা যায় না। ভালো ভালো খাবারের উপাদান আনা হলে, সে ধরনের পাচক না থাকলে কে রান্না করবে আর কে সুস্বাদু খাবার তৈরি করবে? লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পড়ানোর জন্য কতজন উপযুক্ত শিক্ষক আছেন? বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কিছুটা পড়াশোনা হয়। কারণ শিক্ষকদের জবাবদিহি আছে এবং আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়। তাই তারা একাডেমিকসহ সব ধরনের কার্যাবলি সঠিকভাবে করার চেষ্টা করে। এদের মধ্যে কিছু আছে বিশেষভাবে বিখ্যাত। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে আসতে হয়, লেখাপড়ার চাপ থাকে, দেখেশুনে ভালো শিক্ষক রাখার প্রচেষ্টা চালানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পুরো দেশে হাতে গোনা কয়েকটি। তারাও সব শিক্ষার্থীদের পড়া দেখতে বা ধরতে পারে না। এসব কারণে যেসব শিক্ষার্থীদের পড়তে পারার কথা তারাও পারে না। আর বাকি হাজার হাজার বিদ্যালয়ের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ঢাকাসহ নিজ শ্রেণির বই দেখে পড়তে পারে না। একইভাবে বাংলা ও ইংরেজি কোনোটিই নিজেরা লিখতে পারে না। ফলে এক বিরাট অঙ্কের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়তেই হয়, বাজারের নোট-গাইড পড়তেই হয়। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেতন বেশি, কারণ ভালো শিক্ষক রাখার চেষ্টা, বিভিন্ন ধরনের একাডেমিক ও কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি করানো হয় নিয়মিত।

সরকার একটি যুক্তিযুক্ত নিয়ম করে দিতে পারে, কোনো প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ফি যাতে আদায় না করে। কিন্তু কোনো ধরনের ফি আদায় করা যাবে না, পুনঃভর্তি ফি আদায় করা যাবে না কথাগুলো খুব সাধারণ হয়ে যাচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করলে হবে না। সেখানে শিক্ষার্থীর বেতন নেই বললেই চলে (বিশ ত্রিশ টাকা)। ফলে তারা শুধুই প্রাইভেট পড়ে আর কোচিংয়ে পড়ে। এখানকার শিক্ষকদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো এত জবাবদিহিও নেই। এবারের রমজানে কথা ছিল, অন্তত মার্চের ৫ তারিখ পর্যন্ত (গতকাল) বিদ্যালয়ের কার্যক্রম কম করে হলেও চলবে। কারণ শিক্ষার্থীরা বছরে ১২০ দিন ক্লাস করার সুযোগ পায়। তা ওই উন্নতমানের এবং চাপে রাখা প্রতিষ্ঠানগুলো মোটামুটি ভালোভাবে করিয়ে থাকে। কিন্তু সরকারি বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ওই ১২০ দিন ক্লাসও ঠিকমতো করাতে পারে না। ফলে শিক্ষার্থীরা দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের মতো সারাজীবনই একাডেমিক অপুষ্টিতে ভোগে। এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু বন্ধ হয়ে গেছে, প্রাইভেট পড়ানো শিক্ষকদের হয়েছে ‘পোয়াবারো’। আমাদের সমস্যা কারিকুলাম নয়, প্রচলিত কারিকুলাম যেভাবে আছে তাই যদি অন্তত ৭০-৮০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা যেত, তাহলে কোনো সমস্যা থাকত না। আমরা মনে করি, কারিকুলাম পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন ঠিকভাবে পাঠদান-মূল্যায়ন। খয়রাতির পাস না করানো, শিক্ষার্থীরা যা উত্তর দিয়েছে সেই নম্বরই পাবে। এমনটি নয় যে, আমাদের কারিকুলামের ওপর লিখিত পুস্তকাদি পড়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক হতে পারছে না, ডাক্তার হতে পারবেন বা প্রকৌশলী হতে পারবে না, গবেষক হতে পারবে না, বিদেশে পড়াশোন করতে পারবে না।

যারা সিরিয়াস, যারা নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে পড়ে এবং অভিভাবক একটু খোঁজখবর নেয় তারা এই কারিকুলাম পড়েই, কিন্তু বিদেশে যাচ্ছে এবং গিয়েছে, বিদেশের নামিদামি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে এবং সফলতার স্বাক্ষরও রাখছে। বিষয়টি আমাদের নিশ্চিত করতে হবে ম্যাক্সিমাম নম্বর অব শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যাতে এই বিষয়গুলো ঘটে। এই কারিকুলাম অনুসরণ করে ম্যাক্সিমাম নম্বর অব শিক্ষার্থী যাতে এখন মুষ্টিমেয় শিক্ষার্থী নিজ প্রচেষ্টা, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তার যে ভালো করছে সেই ভালো তারাও করতে পারে। আর সে জন্যই প্রয়োজন শিক্ষার্থীরা যা লিখবে সেই রকম নম্বরই পাবে, শিক্ষার্থীদের জানার সোর্স উন্মুক্ত করে দিতে হবে, কোনো বাধানিষেধ দেওয়া যাবে না আর পরীক্ষার প্রশ্ন এমনভাবে করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের বই পড়তে হয়, নিজের বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে হয় এবং বাস্তবভিত্তিক কিছু অ্যাসেসমেন্ট যেমন উপস্থাপনা, বক্তৃতা, ইংরেজিতে কথা বলা, বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ওপর অরজিনাল প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা নিতে পারলে অনেকটা কাজ হবে। এটি নিশ্চিত করতে পারলে শিক্ষার্থীরা পড়তে বসবে, ক্লাসে আসবে আর শিক্ষকরাও কিছুট আনন্দিত হয়ে এবং কিছুটা বাধ্য হয়ে পড়াশোনা করবেন। শুধু প্রশিক্ষণের অপেক্ষায় থেকে থেকে কোনো দিক হয় না। উপরোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে ধীরে ধীরে শিক্ষা মানের দিকে এগোবে।

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

প্রেসিডেন্ট : ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত