মরুভূমির তপ্ত বালুকে যেমন এক পশলা বৃষ্টি শীতল করে দেয়, তেমনি মুমিনের কলুষিত আত্মাকে ধুয়ে-মুছে পবিত্র করার এক বেহেশতি পরশ নিয়ে আসে পবিত্র রমজান। রমজানের ত্রিশ দিনকে দশ দিন করে স্বতন্ত্র তিনটি বৈশিষ্ট্য দ্বারা বিন্যাস করা হয়েছে। রহমতের দশ দিন শেষ হয়েছে। রহমতের দিনগুলোতে মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় ধন্য হয়েছে পৃথিবীবাসী। এখন মাগফিরাতের সময় চলছে। মাগফিরাত অর্থ মাফ, মার্জনা, আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা এবং গুনাহ থেকে নিষ্কৃতি লাভ। মহান আল্লাহর অফুরন্ত দয়া ও ক্ষমা আমাদের ঘিরে আছে, শুধু প্রয়োজন তা গ্রহণ করার মতো একটি নির্মল মন, একটি পরিশ্রমী দেহ। যারা শয়তানের কুপ্ররোচনায় গুনাহ করে ফেলে এবং গুনাহ থেকে মাগফিরাত লাভ করতে পারে না, তাদের জন্য মাগফিরাত লাভের বিশেষ সুযোগ হলো রমজানের দ্বিতীয় দশ দিন। মহান আল্লাহ রমজানের দ্বিতীয় দশ দিনে বান্দাদের ব্যাপকহারে ক্ষমা করেন। মাগফিরাতের এই দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ হিসেবে আমরা অপূর্ণ হতে পারি, কিন্তু আমাদের রবের ক্ষমা করার ক্ষমতা ও তার প্রশস্ততা অপরিসীম।
গুনাহগার বান্দা অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে মহান আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। মহান আল্লাহ হলেন পরম ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে আমার বান্দাগণ! তোমরা রাত-দিন অপরাধ করে থাকো। আর আমিই সব অপরাধ ক্ষমা করি। সুতরাং তোমরা আমার কাছে মাগফিরাত প্রার্থনা করো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিব।’ (সহিহ মুসলিম ৬৪৬) রমজান ইবাদতের মাস। এই মাসে মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থেকে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন। রমজান মাসে সাহরি খাওয়ার জন্য ঘুম থেকে ওঠতে হয়। এই সময়কে কাজে লাগানো চাই। সাহরির সময়টুকু ক্ষমা লাভের বিশেষ এক মুহূর্ত। এই মুহূর্তে মহান আল্লাহ অপেক্ষায় থাকেন বান্দাকে ক্ষমা করার জন্য। বান্দার কাজ হলো, ইবাদতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মর্যাদাবান প্রভু দুনিয়ার আকাশে নেমে এসে বলেন, যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে, আমি তাকে তা দান করব। যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। (মিশকাত ১২২৩)
রমজানের মাগফিরাতের এ সময়ে ক্ষমা লাভের জন্য সব সময় জিকির-আজকারের মাধ্যমে মহান আল্লাহকে স্মরণ করা চাই। মহান আল্লাহকে বান্দা যত বেশি স্মরণ করবে আল্লাহও বান্দাকে ততবেশি স্মরণ রাখবে। বান্দা যদি মহান আল্লাহর স্মরণে থাকে, তবে আল্লাহর নিকটবর্তী হবে। আর আল্লাহর নিকটবর্তী হলেই ক্ষমা লাভ করা সম্ভব হবে। কেননা কারও থেকে কিছু পেতে হলে তার নিকটে আসতে হয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, আমার সম্পর্কে বান্দা যেমন ধারণা করবে, সে অনুসারে আমি তার সঙ্গে আছি। আমি তার সঙ্গে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। সে যদি আমাকে তার মনে মনে স্মরণ করে, তবে আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। আর যদি সে কোনো সমাবেশে আমার স্মরণ করে, তবে এর চেয়েও উত্তম এক সমাবেশে আমি তার স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে অর্ধ হাত নিকটবর্তী হয়, তবে আমি তার দিকে এক হাত পরিমাণ নিকটবর্তী হই। যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে, তবে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। (তিরমিজি ৩৬০৩)
হাদিসের ব্যাখ্যায় আমাশ (রহ.) বলেন, আমি তার এক হাত নিকটবর্তী হই, এর মর্ম হলো, আমার রহমত ও মাগফিরাতকে বান্দার নিকটবর্তী করি। বান্দা যখন আমার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে এবং আমার নির্দেশ পালন করে নিকটবর্তী হয়, তখন তার প্রতি আমার মাগফিরাত ও রহমত অতি দ্রুত অগ্রসর হয়। রাসুল (সা.) সৃষ্টিজীবের জন্য রহমতস্বরূপ। তিনি আমাদের মাগফিরাত লাভের অন্যতম মাধ্যম। তার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করলে ক্ষমা লাভের পথ সুগম হয়। তাই রমজানের মাগফিরাতের এ সময়ে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা চাই। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুল (সা.) বলেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনাকে কি এই সংবাদ খুশি করে না যে, আপনার উম্মতের মধ্য থেকে যদি কোনো ব্যক্তি আপনার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে তবে আমি তার জন্য দশবার মাগফিরাত চাইব। আর কেউ যদি আপনাকে একবার সালাম পাঠায় আমি তার প্রতি দশবার সালাম পাঠাব। (নাসায়ি ১২৯৮)
মহান আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল। তিনি বান্দাদের ব্যাপকহারে ক্ষমা করবেন বলেই রমজানের দ্বিতীয় দশ দিনকে করেছেন মাগফিরাতময়। মহান আল্লাহ ক্ষমা করতে প্রস্তুত। বান্দার করণীয় হলো, গুনাহের কারণে অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়া। রমজানের এই মুহূর্তগুলো আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের অনন্য সিঁড়ি। মাগফিরাতের এই দিনগুলোতে আমরা যদি বিনম্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন হতে পারি, তবেই আমাদের দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনা সার্থক হয়ে উঠবে। স্রষ্টার ক্ষমা পাওয়ার আকুলতা যার হৃদয়ে যত গভীর, তার প্রাপ্তিও ততটাই বিশাল। সাহরির স্নিগ্ধ প্রহরে যখন পৃথিবী নিস্তব্ধ থাকে, তখন আমাদের অশ্রুভেজা প্রার্থনা হতে পারে ক্ষমা লাভের প্রধান হাতিয়ার। মাগফিরাত মানে কেবল অপরাধের ক্ষমা নয়, বরং এক নতুন জীবনের শুরু, যেখানে থাকবে না কোনো পাপ-কালিমা।
অনুশোচনার আগুনে পুড়িয়ে নিজের ভেতরের পাপকে ভস্মীভূত করে এক বিশুদ্ধ ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার দৃঢ় সংকল্পই হোক এই মাগফিরাতের মূল শিক্ষা। আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন মহান রবের সন্তুষ্টির অভিমুখে ধাবিত হয় এবং আমাদের ইহকাল ও পরকালকে কল্যাণময় করে তোলে। মাগফিরাতের এই অমূল্য প্রাপ্তি যেন প্রতিটি মুমিনের জীবনের পাথেয় হয়ে থাকে।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক