তো  মা  দে  র   ব  ই

সারা দেশে যেভাবে ছড়িয়েছিল ভাষা আন্দোলন

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৯ এএম

রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশের গ-ি পেরিয়ে বিশ্বদরবারে ভাষা আন্দোলন পৌঁছে গেলেও এখনো বাংলাভাষী বড় অংশের পাঠকের কাছে ভাষা আন্দোলন মানে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে মিছিল। কিন্তু বলাই বাহুল্য, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এর থেকে বিস্তৃত। ভাষার প্রতি এই সচেতনা শুরু হয়েছিল ইংরেজ শাসনামলের শেষ দিকে। অবশেষে যখন এক প্রকার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, অখ- ভারত ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন সৃষ্টি হবে তখন থেকেই সবার মনে প্রশ্ন জাগল, পাকিস্তানের ভাষা কী হবে? বাংলাভাষী কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গঠন করতে শুরু করেন। ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত সেখান থেকেই। ভাষা আন্দোলনের কথা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলঘœ রাজপথ। ছাত্র-জনতার পরিকল্পিতভাবে ১৪৪ ধারা অবমাননা। পুলিশের লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ। সালাম-রফিক-বরকত-জব্বার-শফিউরের জীবন দান। তাদের অমূল্য আত্মত্যাগের ফলেই আমরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে পেয়েছি এ কথা সত্য, কিন্তু মনে রাখতে হবে ভাষা আন্দোলন শুধু প্রদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার কারণেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই ন্যায্য দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু সেই ইতিহাস তরুণ প্রজন্মসহ অনেকের কাছেই অজানা। সেই অজানা ইতিহাসই তুলে ধরেছেন ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক তার ‘ভাষা আন্দোলন : টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ বইয়ে।

আহমদ রফিক ভাষা আন্দোলনের একজন সংগঠক এবং নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য পরবর্তী জীবনে তাকে নানা প্রতিরোধের মধ্যে পড়তে হয়েছে। এক সময় তার উচ্চশিক্ষাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময় উচ্চশিক্ষা (চিকিৎসাশাস্ত্রে) গ্রহণ করতে পারলেও পছন্দের বিষয়ে পড়ার ইচ্ছা রয়ে যায় অধরা। তবে যত তিনি প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছেন ততই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার কাজে ব্রতী হয়েছেন, গবেষণা ও লেখনীর মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনকে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন।

‘ভাষা আন্দোলন : টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ বইয়ে তিনি দেশের ৫৬টি অঞ্চলে সংগঠিত ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ তুলে ধরেছেন। আক্ষরিক অর্থের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সারা দেশে ভাষা আন্দোলন যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তার চিত্র তুলে ধরেছেন। সারা দেশে আত্মপরিচয়ের জন্য যে সচেতনতা গড়ে উঠেছিল সেটিই ধীরে ধীরে স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত হয়েছিল। বইটির ভূমিকাতে লেখক বলেছেন, “... এ আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ও সংশ্লিষ্ট আন্দোলন ও একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও তার পরিণামের ‘সূতিকাগার’”। তাই শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, স্বাধীনতা সংগ্রাম কীভাবে দানা বেঁধে উঠেছিল তার স্বরূপ জানার জন্যও বইটি পড়া গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় পর্যায়ে সমাবেশ ও মিছিল করার সময় আন্দোলনকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছেন। এই আন্দোলনের বিরুদ্ধেও পাল্টা মিটিং মিছিল হয়েছে। লক্ষণীয়, সেদিনের ভাষাবিরোধীরা (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছিল। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রাম এভাবেই একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের রহস্য উন্মোচনকারী এ বইটি তোমাদের ভালো লাগবে।

সুলতানা রাজিয়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত