ইরান সংকটে কতটা অসহায় বেইজিং?

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:১৭ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হওয়া যুদ্ধের উত্তাপ সরাসরি বেইজিংয়ে না পৌঁছালেও, এর ঢেউ কাঁপিয়ে দিচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির ভিত্তি। আপাতদৃষ্টিতে চীনের কাছে কয়েক মাসের জ্বালানি তেলের মজুদ থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধ দেশটির বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক উচ্চাভিলাষকে খাদের কিনারে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

বর্তমানে বেইজিংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির হাজার হাজার প্রতিনিধি বার্ষিক অধিবেশনে মিলিত হয়েছেন। আবাসন খাতের সংকট, ঋণের পাহাড় এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থবির ভোগের কারণে চীনের অর্থনীতি এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বেইজিং তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ১৯৯১ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নির্ধারণ করেছে।

চীন আশা করেছিল, উচ্চপ্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রপ্তানির মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ এবং এখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা তাদের সেই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অবরুদ্ধ হলে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পশ্চিমা বিশ্বে ইরানকে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হলেও বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ২০১৬ সালে শি জিনপিংয়ের তেহরান সফর এবং ২০২১ সালে ২৫ বছর মেয়াদী কৌশলগত চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ কাছাকাছি আসে। চীন ইরান থেকে দৈনিক প্রায় ১৩.৮ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করে, যা তাদের মোট আমদানির ১২ শতাংশ। অভিযোগ রয়েছে, এই তেলের উৎস লুকাতে মালয়েশিয়ার লেবেল ব্যবহার করা হয়।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সম্পর্ক যতটা না আদর্শিক, তার চেয়ে বেশি লেনদেনভিত্তিক। লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক কেরি ব্রাউন বলেন, ‘চীন ও ইরানের মধ্যে কোনো গভীর সাংস্কৃতিক বা আদর্শিক মিল নেই। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মাথাব্যথার কারণ-কেবল এই নেতিবাচক কারণেই চীন দেশটিকে কাছে টেনেছে। এটি একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর ভিত্তি।’

ভেনিজুয়েলা এবং সাম্প্রতিক ইরান সংকটে দেখা গেছে, চীন তার মিত্রদের রক্ষায় সামরিকভাবে অক্ষম। রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ফিলিপ শেটলার-জোনস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়ে দিচ্ছে সুপারপাওয়ার হওয়ার প্রকৃত অর্থ কী-বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা। চীন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও তার বন্ধুদের এই ধরনের হামলা থেকে রক্ষা করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।’

বেইজিং এখন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে একটি ‘দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। বেইজিং এখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করছে এবং এ লক্ষ্যে বিশেষ দূত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।

চলতি মাসের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। এই যুদ্ধ সফরের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা থাকলেও দুই দেশই আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চীন খুব সতর্কভাবে ট্রাম্পের সমালোচনা এড়িয়ে চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেইজিং এখন পর্যবেক্ষণ করছে যে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্য সংকটে কতটা সংযত থাকে। যদি যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে জনপ্রিয়তা হারায় এবং বৈশ্বিক রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে, তবে তাইওয়ানসহ নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য চীন বড় সুযোগ পেয়ে যেতে পারে।

তবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি ‘অপ্রত্যাশিত ও অস্থিতিশীল’ খেলোয়াড়কে নিয়ে বেইজিং অস্বস্তিতেই আছে। তারা চায় না বিশ্ব এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র শাসিত হোক, আবার ওয়াশিংটন এতটাই অস্থির হয়ে উঠুক যে বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনাই ভেঙে পড়ে- এমনটাও বেইজিংয়ের কাম্য নয়।

সূত্র: বিবিসি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত