সংঘাত বিস্তৃত, দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে প্রস্তুত ইরান

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৮ এএম

ইরান জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চল। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক, বাহরাইনসহ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা আছে এমন স্থানে তেহরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা-হামলা অব্যাহত রাখায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এতে একদিকে বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা, অন্যদিকে দেশে দেশে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ছেন বেসামরিক নাগরিকরা।

আকাশপথে টানা লড়াইয়ের পর সপ্তম দিনে এসে ইরান এখন দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্র স্থলপথেও সৈন্য নামাতে পারে, এমন আশঙ্কার মুখে তা মোকাবিলার প্রস্তুতির কথা বলছে পারস্য উপসাগর তীরের দেশটি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুমকি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে কোনো ধরনের স্থল অভিযান চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে তা ওয়াশিংটনের জন্য ‘মহাবিপর্যয়’ ডেকে আনবে।

ইসরায়েলের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রধান ও বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বেন গুরিয়নে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন জানায়, জর্ডানে মোতায়েন করা অত্যাধুনিক ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার সিস্টেম গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইরান।

এর মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গতকাল এক্সে এক পোস্টে জানান, কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা শুরু করেছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চান, তারা এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু নিজেদের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবেন না। যারা ইরানের জনগণকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে এবং এই সংঘাত শুরু করেছে, মধ্যস্থতাকারীদের উচিত তাদের বিষয়ে সুরাহা করা।

যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়ে যাওয়ায় ইরানের চারপাশে বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থলপথে সৈন্য নামানোকে ‘সময় নষ্ট’ হিসেবে অভিহিত করলেও তার এমন মন্তব্য ‘কৌশল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ট্রাম্প চান ইরান নিঃশর্ত আত্মসমর্থন করুক। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।’ আত্মসমর্পণের পর নতুন ‘গ্রহণযোগ্য’ ইরানি নেতাদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠনে সাহায্য করবে। অন্যদিকে, ইরানের সামরিক বাহিনী আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। আইআরজিসি মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নায়েইনি এক বিবৃতিতে বলেন, ইরানের শত্রুরা যেন সামনের দিনগুলোতে ‘যন্ত্রণাদায়ক আঘাতের’ জন্য প্রস্তুত থাকে। ইরানের নতুন সব সামরিক উদ্যোগ ও আধুনিক অস্ত্র আসার পথে রয়েছে। এ প্রযুক্তিগুলো এখনো বড় পরিসরে মোতায়েন করা হয়নি।

নায়েইনি আরও বলেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় ইরান এখন সামরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। চলমান এ যুদ্ধকে তিনি ‘পবিত্র ও বৈধ যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

ইরান রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় গতকাল পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৩২ জনে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযানের বিষয়ে কড়া বার্তা দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। এনবিসি নিউজকে গত বৃহস্পতিবার দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে স্থল আক্রমণ নিয়ে কোনো ভয় আছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে আরাঘচি বলেন, ‘না, আমরা তাদের (মার্কিন স্থলবাহিনী) জন্য অপেক্ষা করছি।’ তিনি দাবি করেন, যেকোনো স্থল হামলা মোকাবিলা করতে ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত।

সংঘাত চরম আকার ধারণ করলেও, ইরান এখন পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতি চায়নি বলে জানান আরাঘচি। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেবারও ইসরায়েলই যুদ্ধবিরতি চেয়েছিল, ইরান নয়। তিনি আরও বলেন, ‘এ যুদ্ধে কোনো বিজয়ী নেই; আমাদের জয় হলো আমরা শত্রুদের প্রতিরোধ করতে পারছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, ইরান থেকে প্রায় ৫০০ মাইলের বেশি দূরে জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত একটি রাডার নিখুঁত নিশানায় ধ্বংস করা হয়েছে। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য একটি বড় কৌশলগত ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধ্বংস হওয়া রাডারটি ‘থাড’ ব্যবস্থার মূল ‘চোখ’ হিসেবে কাজ করত। এটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা এবং তা মাঝ আকাশে ধ্বংস করার জন্য ইন্টারসেপ্টরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু চিনিয়ে দিতে ব্যবহৃত হতো।

ইরানের এমন হামলার আওতা শুধু জর্ডানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি স্থানেও একই ধরনের রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে আমিরাতে থাকা সরঞ্জামগুলোর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, থাড রাডার ধ্বংস হওয়ার ফলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই রাডার ছাড়া থাড ব্যাটারিগুলো কার্যকরভাবে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত বা প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না।

এদিকে কুয়েত উপকূলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে ইরান। ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারিও এ দাবি করেন।

তবে ইরানে প্রথমবারের মতো বি-২ বিমান থেকে বোমা ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমানগুলো গতকাল ইরানের ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলো লক্ষ্য করে ডজনখানেক ২০০০ পাউন্ডের ‘পেনিট্রেটর’ বোমা (ভূগর্ভে প্রবেশ করে ধ্বংস ঘটাতে সক্ষম) নিক্ষেপ করেছে।

খামেনির উত্তরসূরির নাম ঘোষণা স্থগিত : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহতের পর এক সপ্তাহ পার হলেও এখনো তার উত্তরসূরি ঘোষণা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই ইরানি কর্মকর্তার বরাতে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, নিরাপত্তা নিয়ে ইসরায়েলের হুমকির মুখে খামেনির উত্তরসূরি ঘোষণার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে ইরান।

তবে ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর নতুন কমান্ডার হিসেবে আহমাদ ওয়াহিদির নাম ঘোষণা করেছে আইআরজিসি। গত ডিসেম্বরে খামেনি আইআরজিসির উপপ্রধান হিসেবে ওয়াহিদিকে মনোনীত করেছিলেন। এর আগে তিনি ইরানের সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত