নারীর জন্য নিরাপদ বিশ্ব 

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৭ এএম

এমন এক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ‘নারী দিবস’ পালিত হচ্ছে, যখন বিশ্ব অস্থিরতার মুখোমুখি। বাংলাদেশেও একের পর এক ঘটছে,  নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। সম্প্রতি সীতাকুণ্ডে সাত বছর বয়সী শিশু ইরামনিকে ধর্ষণের পর,  গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় শিশুটির। গলাকাটা অবস্থায় নির্যাতনের শিকার শিশুটি নিজেই বেরিয়ে এসেছিল ইকোপার্ক থেকে। ভাবতেও পারছি না, এমন নির্মমতা কীভাবে সম্ভব। এর কিছুদিন আগেই পাবনার ঈশ্বরদীতে দাদিকে হত্যা করে কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে এক নরপিশাচ। নরসিংদীর মাধবদীতে আরেকটি নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীকে অপহরণ করে হত্যা করেছে একদল নরঘাতক। ঢাকায় বিন্তি নামের এক স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে তারই সহপাঠী কিশোর। পাঁচ বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি। পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা এসব যেন নারীর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে পথঘাটে, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি তো রয়েছেই। বলতে গেলে, প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে নারীর প্রতি সহিংসতার খবর। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী,  চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জানুয়ারিতে ৩১টি পারিবারিক পরিবেশে চালানো সহিংসতা, ৩৫টি ধর্ষণ, ২টি যৌন হেনস্তা এবং ৬টি কন্যাবিবাহ ও দাম্পত্যবিষয়ক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনটিতে নারী নির্যাতনের ধরন অনুযায়ী দেখা গেছে, পারিবারিক সহিংসতার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ৩১টি, যা পরিবার ও সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার প্রমাণ। ধর্ষণের ৩৫টি ঘটনা এবং যৌন হেনস্তার ২টি ঘটনা নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। পাশাপাশি, যৌতুক সম্পর্কিত সহিংসতার ঘটনা ছয়টি এবং গৃহকর্মী নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনা ১টি।

জানুয়ারি মাসে শিশুদের ওপর সহিংসতার ৩৫টি ঘটনা ঘটেছে এবং শিশু হত্যার ঘটনা ২৫টি হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় বিবেকবান সব নাগরিকই শংকিতবোধ করবেন নিঃসন্দেহে। নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে। যে দেশে নারী ও শিশু নিরাপদ নয়, সে দেশ বা সমাজকে ‘সভ্য’ বলে দাবি করার কোন পথ খোলা থাকে না। নারীর প্রতি সব প্রকার বৈষম্য বিলোপ এবং নারীর অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বিশ্ব জুড়ে পালিত হচ্ছে নারী দিবস। এ প্রসঙ্গে নারী দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে একটু আলোকপাত করা যেতে পারে। নারী দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীর অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে প্রতিবাদ মিছিল করেন নারী শ্রমিকরা। সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা ১৮৫৭ সালে মজুরিবৈষম্য, আট ঘণ্টার মধ্যে শ্রম সময় নির্দিষ্ট করা এবং কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসেন। তাদের এই প্রতিবাদ মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সরকারের পুলিশ বাহিনী। চলে দমন ও নিপীড়ন। শ্রমিকদের জন্য কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করার দাবি শেষ পর্যন্ত আদায় হয়। তবে নারী ও পুরুষের মজুরি বৈষম্য চলতেই থাকে। সে সময় থেকেই মানবমুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় নারী মুক্তির আন্দোলন। ১৯০৯ সালে নিউ ইয়র্কে সোশ্যাল ডেমোক্রেট নারী সংগঠনের আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নারী নেতা ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়।

১৯১০ সালে  ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশে^র বিভিন্ন দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হতে থাকে। বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে নারী দিবস পালন করা হয় অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করে। নারীর প্রতি সব প্রকার বৈষম্য বিলোপ করা এবং নারীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়।  নারী মুক্তির পথে মিশে আছে বহু মানুষের আত্মদান। নারীর ভোটাধিকারের জন্য ইউরোপে স্যাফ্রোজেটদের আন্দোলন, রুশ বিপ্লব, চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সবকিছুই নারী মুক্তির ধারাকে বেগবান করেছে। ভার্জিনিয়া উলফ, সিমোন বোভেয়ার, বেটি ফ্রিডানসহ মানবাধিকার লেখকরা নারীর পরাধীনতার স্বরূপ উদঘাটন করে, সভ্য সমাজের চিন্তাজগতে নিয়ে এসেছে বিপ্লব। ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর ওপর নির্যাতন কম হয়নি। কখনো ধর্মের নামে, কখনো সামাজিক প্রথার নামে তার কণ্ঠকে রুদ্ধ করা হয়েছে বারবার। গার্গী, মৈত্রেয়ীর মতো শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ নারী যে ভূখণ্ডে ছিলেন সেখানেই পরবর্তীকালে নারীর বিদ্যাশিক্ষা পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এদেশে গৌরীদান ও রোহিনীদানের নামে বাল্যবিবাহের যাঁতাকলে পিষ্ট করা হয়েছে নারীকে। সতীদাহের নামে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। বিধবার ওপর সহস্র নিয়মকানুনের বোঝা চাপিয়ে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে তিলে তিলে। পর্দা প্রথার নামে নারীর ওপর কি ভয়াবহ নিষ্পেষণ চলেছে তা বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’ বইয়ের পাতায় পাতায় বিধৃত হয়েছে। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সরলা ঘোষাল, নবাব ফয়জুননেসা, বেগম রোকেয়ার মতো মহামানবদের প্রচেষ্টায় এদেশের নারীর জন্য ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয়েছে জীবনের পথ। পরবর্তী সময় বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামালের মতো নারীরা এগিয়ে এসেছেন নির্যাতনের ঘেরাটোপ থেকে নারীকে বাঁচাতে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন শুরু হওয়ার পর একশ বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এখনো কি সারা বিশ্বে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে? কোথায় নারী নিরাপদ? বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কায়দায় তার ওপর চলছে নির্যাতন, সহিংসতা ও বৈষম্য। জন্ম নেওয়ার আগে ভ্রুণ অবস্থাতে তাকে হত্যা করা হচ্ছে। জন্মের পর অবহেলা করা হচ্ছে। অপুষ্টির শিকার হতে হচ্ছে তাকে, হতে হচ্ছে নানা রকম বৈষম্যের শিকার। অনেক দেশে কিশোর বয়সে তার অঙ্গহানি করা হচ্ছে, অপ্রাপ্ত বয়সে তাকে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের হাতে শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, পথঘাটে তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে। পারিবারিক সম্মানরক্ষার নামে তাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মৃত্যুর মুখে। অনেক দেশে তাকে ভোটাধিকার দেওয়া হয়নি। তাকে অর্থনৈতিক অধিকার দেওয়া হয়নি। কোথাও তাকে ঘরে বন্ধ করে রাখা হয়েছে, কোথাও বা তাকে যৌনসামগ্রী হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে।

কিছুদিন আগে এপস্টিন ফাইলস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ তোলপাড় হলো। সেখানে মার্কিন ধনকুবের এপস্টিনের আমন্ত্রণে, তার নিজস্ব দ্বীপে কখনো এপস্টিনের দ্বারা আবার কখনো তার সঙ্গীসাথি ও অতিথিদের মাধ্যমে কীভাবে নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কী বীভৎস সেই দলিল, যা এপস্টিন ফাইলস নামে পরিচিত। সেই ফাইল এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। এতে প্রমাণ হয় যে, নারীর নিরাপত্তা এখনো পাশ্চাত্যেও পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পার্থক্য হলো, পাশ্চাত্যে এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ হলে এবং অপরাধীরা ধরা পড়লে তার বিচার ঠিকভাবে হয়। কঠোর শাস্তিও নিশ্চিত করা হয়। আমাদের দেশে নারী-শিশু নির্যাতন ও হত্যা-ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে তার বিচার প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ যে, প্রকৃত অপরাধী অনেক সময় শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে। দীর্ঘসূত্রী বিচার এক ধরনের অবিচার,  এ কথা আমরা সবাই জানি। সাধারণত, ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশু দরিদ্র পরিবারের হয়ে থাকে এবং বছরের পর বছর মামলা চালানোর মতো সক্ষমতা তাদের থাকে না। ধর্ষক সাধারণতই ভিকটিমের তুলনায় প্রভাবশালী হওয়ায় তারা নানা রকম ভয়ভীতি দেখায়, মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে এবং অনেক সময় জামিনে বের হয়ে ভিকটিমকে হত্যা করে অথবা ভিকটিমের পরিবারকে গ্রামছাড়া করে। ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়া ভিকটিমের পরিবারকে বোঝানো হয়, মেয়েটি যখন মরেই গেছে তখন আর শত্রুতা রেখে কী লাভ!  গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে ধর্ষককে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাও প্রচুর। ভিকটিম জীবিত থাকলে, গ্রাম্য সালিশে অনেক সময় ধর্ষক ও ভিকটিমের বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়। ধর্ষণ রোধ করার জন্য প্রয়োজন, ধর্ষণ ও নারী-শিশু হত্যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেই প্রকাশ্যে দ্রুত বিচারের আওতায় মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং সেটি দ্রুত কার্যকর করা। একমাত্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই, ধর্ষক নরপশুদের সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব।

নারী নির্যাতন রোধে কঠোর আইন ও শাস্তি দ্রুত বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করা সবচেয়ে জরুরি। নারী ও শিশু নির্যাতন যে অতি ঘৃণ্য ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ এবং এ জন্য যে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, তা সমাজের সর্বত্র প্রচার করা দরকার। এর ফলে সম্ভাব্য অপরাধীরা শাস্তির ভয়ে কিছুটা হলেও, অপরাধ থেকে দূরে থাকার কথা ভাববে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে এবং তা দ্রুত কার্যকর হলে সেটাও সম্ভাব্য অপরাধীদের ভয় দেখাতে সক্ষম হবে। নারীকে শুধু যে সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে হবে তা নয়, তার জীবনমান উন্নয়ন এবং ন্যায্য অধিকার অর্জনের পথও নিশ্চিত করতে হবে। বস্তুত, প্রতিটি সমস্যা একটির সঙ্গে অন্যটি জড়িত। নারীর শিক্ষাব্যবস্থা করতে হবে, বাল্যবিয়ে রোধ করে উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রসহ সর্বত্র নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারী যেন ঘরে-বাইরে সর্বত্র নিরাপদ থাকে সেজন্য আইন ও তার প্রয়োগকে নিশ্চিত করা দরকার। সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার, মজুরি বৈষম্য নিরসন, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি, শিক্ষার অধিকার, কর্মসংস্থান সবকিছুই একটি অন্যটির সঙ্গে জড়িত। নারীর ক্ষমতায়ন মানে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন। এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার।’ নারীর অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য চাই, সরকার থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ে যথাযথ কার্যকর উদ্যোগ। আজকের কার্যকর পদক্ষেপ,  আগামীতে নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ বিশ্ব সৃষ্টিতে অবদান রাখবেÑ এটাই নারী দিবসের প্রত্যাশা।

লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক  শিক্ষক, ইয়ুননান বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত