বিকল্প চিন্তায় বিএনপি

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৮:০০ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আগামী ১২ মার্চ, বৃহস্পতিবার। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়ে থাকে। সাধারণত বিদায়ী সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকার নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করে থাকেন। বৈঠকের শুরুতেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হয়। গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কার্যত ‘না থাকায়’ নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রথম বৈঠকে কে সভাপতিত্ব করবেন, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, বিদায়ী স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করায় নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রথম বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন সভাপতিত্ব করতে পারেন কি না। এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে গতকাল রবিবার বলেন, ‘সংবিধানে এমন কোনো সুযোগ নেই, বিধান নেই।’

সংসদ সদস্য হিসেবে অভিজ্ঞতা রয়েছে, এবারকার নতুন সংসদেও নির্বাচিত হয়েছেন, এমন বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিদায়ী সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকলে একজন নির্বাচিত সদস্যকেই প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করার বিধান আছে।

সরকারদলীয় হুইপ অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু দেশ রূপান্তরকে গতকাল বলেন, ‘সংসদের প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন তা এখনো ঠিক হয়নি। সংসদ নেতা তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।’

গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর থেকে বিদায়ী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ‘নিখোঁজ’। আর বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে আছেন।

দেড় বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে দুই-

তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সংবিধান অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের ফল সরকারিভাবে ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠক শুরু হতে হয়।

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত ২২ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রস্তুতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশন আহ্বান করবেন। এ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। রাষ্ট্রপতি সেই মতে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করবেন, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে।’

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ইতিমধ্যে আগামী ১২ মার্চ বেলা ১১টায় এ অধিবেশন ডেকেছেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন করা হবে। শোক প্রস্তাব ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ হবে।

অন্য একজন হুইপ দেশ রূপান্তরকে গতকাল বলেন, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রস্তুতি এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও হুইপদের নিযুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। হুইপরা অধিবেশনে সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করাসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, প্রথম বৈঠকের শুরুতেই সংসদ নেতা অথবা তার নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি দলের চিফ হুইপ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনের নাম স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রস্তাব করতে পারেন। প্রস্তাবকৃত সদস্য নতুন সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারেন।

তিনি বলেন, নতুন সংসদের ও নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আগে থেকেই সংসদ ভবনে নিজের চেম্বারে অবস্থান করবেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচন হয়ে গেলে অধিবেশনে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি হবে। এ বিরতির সময় রাষ্ট্রপতি তার চেম্বারে নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হবে।

স্পিকার নির্বাচন হয় কীভাবে : জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সময়ের অন্তত এক ঘণ্টা আগে যেকোনো সদস্য অন্য কোনো সদস্যকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে সম্বোধন করে লিখিতভাবে একটি প্রস্তাবের নোটিস দিতে পারেন। এই নোটিস তৃতীয় একজন সদস্য কর্তৃক সমর্থিত হতে হয়। যার নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি নির্বাচিত হলে স্পিকার হিসেবে কাজ করতে সম্মত আছেন, এমন একটি বিবৃতিও নোটিসের সঙ্গে দিতে হয়।

তবে কোনো সদস্য স্পিকার পদে নিজের নাম প্রস্তাব বা সমর্থন করতে পারবেন না। এ ছাড়া কোনো সদস্যের নাম স্পিকার হিসেবে বিবেচনাধীন থাকলে নির্বাচনের সময় তিনি সভাপতিত্ব করতে পারেন না।

যথাযথভাবে উত্থাপিত ও সমর্থিত প্রস্তাবগুলো উত্থাপিত হওয়ার ক্রমানুসারে ভোটে দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। কোনো প্রস্তাব গৃহীত হয়ে গেলে অবশিষ্ট প্রস্তাবগুলো ভোটে দেওয়া হয় না। একই পদ্ধতিতে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়।

কী আছে সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধিতে : সংসদ পরিচালিত হয় প্রধানত সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী। বিদ্যমান সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সম্পর্কিত বিধান আছে। সেখানে বলা আছে, ‘কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করিবেন এবং এই দুই পদের যেকোনোটি শূন্য হইলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা ওই সময়ে সংসদ বৈঠকরত না থাকিলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তাহা পূর্ণ করিবার জন্য সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে নির্বাচিত করিবেন।’

সংবিনের ৭৪(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, স্পিকারের পদ শূন্য হলে বা অন্য কোনো কারণে তিনি স্বীয় দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলে সংসদ নির্ধারণ করলে স্পিকারের সব দায়িত্ব ডেপুটি স্পিকার পালন করবেন। কিংবা ডেপুটি স্পিকারের পদও শূন্য হলে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য এই দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদের কোনো বৈঠকে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারও অনুপস্থিত থাকলে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন।

এবার সংসদ সদস্যদের শপথ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনয়ন দেননি। শপথ পড়িয়েছেন সিইসি। এখন শুধু স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনয়ন দিতে পারেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা আছে।

অন্যদিকে সংবিধানে বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলেও তার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন। এবার সংসদ সদস্যদের শপথ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনয়ন দেননি। শপথ পড়িয়েছেন সিইসি। এখন শুধু স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনয়ন দিতে পারেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা আছে।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২১ ধারায় বলা আছে, স্পিকার বা সংবিধান বা কার্যপ্রণালি বিধির অধীন যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য কোনো সদস্য সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করলে বৈঠক যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। সে হিসেবে যেকোনো সংসদ সদস্য সভাপতিত্ব করতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

আবার কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, স্পিকার কোনো অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিমন্ডলী মনোনীত করেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তারা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। কার্যপ্রণালি বিধির ১২(২) বিধিতে বলা আছে, ‘যদি কোনো সময় সংসদের কোনো বৈঠকে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার বা সভাপতিম-লীর সদস্যদের মধ্যে কেউই উপস্থিত না থাকেন, তাহলে সচিব তা সংসদকে জানাবেন এবং সংসদ একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতিত্ব করার জন্য নির্বাচিত করবেন।’ অবশ্য এটি সংসদের প্রথম বৈঠকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে মতভিন্নতা আছে।

স্পিকার হতে পারেন মঈন খান : সংসদে স্পিকার হিসেবে এমন কাউকে বিবেচনা করা হয় যিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য ছিলেন। সংসদের কার্যক্রম নিয়ে যার ধারণা রয়েছে। সে হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন পাঁচবারের সংসদ সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। ইতিমধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। তবে দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে এখনো কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। প্রবীণ এই নেতাকে কোথায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তা নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে দলের ভেতরে, জনমনেও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্পিকার কে হবেন তা দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্ধারণ করবেন। তাই এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারছি না। অপেক্ষা করেন। ১২ মার্চ সামনে। তার আগেই দেশবাসী জেনে যাবে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নিয়ে ছয়বার এমপি হয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক। তিনি বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে হিসেবে মঈন খানের পর আলোচনায় রয়েছেন জয়নুল আবদিন ফারুক। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাকে দায়িত্ব দেবেন সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। ইতিপূর্বে আমি বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব দিলে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে দায়িত্ব পালন করব।’

এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবদিন। তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসন থেকে তিনি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। সেই সংসদে নির্বাচিত হয়ে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। ২০০১ সালে স্পিকার ছিলেন অ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলী। এরই ধারাবাহিকতায় অ্যাডভোকেট জয়নুল আবদিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছেন না দলের অনেক নেতা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত