উপকূলের ঐতিহ্য নিয়ে শ্যামনগরে ভিন্নধর্মী মেলা

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই বেঁচে আছে উপকূলের মানুষ। সেই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও তারা ধরে রেখেছে হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় শাক-সবজি, বীজ, কৃষি জ্ঞান ও প্রাচীন জীবনযাত্রার নানা উপাদান। উপকূলের মানুষের এই টিকে থাকার সংগ্রাম, অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী কৌশলকে সামনে আনতেই সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমী ‘স্থানীয় অভিযোজন মেলা ও জলবায়ু সংলাপ’।

সোমবার (৯ মার্চ) সকাল থেকে দিনব্যাপী উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট পাইকের মোড় বিলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোগে এই মেলার আয়োজন করা হয়।

মেলার আয়োজক কৃষাণী ও কয়েকশ’ বীজের সংরক্ষণকারী অল্পনা জানান, মেলায় স্থানীয়দের উদ্যোগে দুই ডজনের বেশী স্টলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, স্থানীয় জ্ঞান ও অভিযোজন কৌশল তুলে ধরা হয়। বিশেষ আকর্ষণ ছিল উপকূল অঞ্চলে পাওয়া ১৩০ রকমের দেশীয় ও প্রায় হারিয়ে যাওয়া শাক-সবজির প্রদর্শনী। এর মধ্যে হেলেঞ্চা, কলমি, গিমা, নুনিয়া, কচু শাক, ডাঁটা শাক, শাপলা শাক, বেতো শাক, হাগড়া শাকসহ নানা দেশীয় শাক দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।

একই সঙ্গে মেলায় তুলে ধরা হয় বিলুপ্তপ্রায় কৃষি সামগ্রী ও ঐতিহ্যবাহী উপকরণ। প্রদর্শিত সামগ্রীর মধ্যে ছিল ঢেঁকি, লাঙল, জোয়াল, মই, ধান ঝাড়ার চালুনি, কাঁসার তৈরি পরিমাপের পাত্র, বাঁশের তৈরি মাছ ধরার খাঁচা, খলই, ডালি, কুলো, ঝাঁপি, মাটির তৈজসপত্র ও পুরোনো ধানের গোলা যেগুলো একসময় গ্রামীণ কৃষি ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

এ ছাড়া বিভিন্ন স্টলে উপকূলীয় কৃষি যন্ত্র ও আগাছা ব্যবস্থাপনা, হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের মাছ ধরার উপকরণ, স্থানীয় অভিযোজন চর্চা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যবহার্য উপকরণ, বনজীবীদের ব্যবহার্য সামগ্রী, পরিবেশবান্ধব চুলা, স্থানীয় জাতের বীজ, ধান ও চাল, হস্তশিল্প, মাটির তৈজসপত্র ও শুকনা খাবার প্রদর্শন করা হয়। হাতে আঁকা চিত্রের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু সংকট, প্রাণবৈচিত্র্য এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উদ্যোগও তুলে ধরা হয়।

মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক-কৃষাণীরা অংশগ্রহণ করে তাদের কৃষি সামগ্রী প্রদর্শন করেন। পাশাপাশি সাতক্ষীরার সুন্দরবন উপকূলের ১০৮টি পরিবেশ ও কৃষি সংগঠনের চাষী ভাই-বোনেরা একে অপরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।

দিনব্যাপী আয়োজনে জারি-সারি গান পরিবেশন, চিত্রাঙ্কন ও দেয়ালিকা প্রদর্শনী মেলায় সাংস্কৃতিক আবহ সৃষ্টি করে। স্থানীয় জনগণ, শিক্ষার্থী, নারী সংগঠক, যুবসমাজ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে মেলা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

মেলায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন সবুজ জোটের সভাপতি এম. জিল¬ুর রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম।

উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন বারসিকের পরিচালক ও প্রাণবৈচিত্র্য গবেষক পাভেল পার্থ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস.এম. দেলোয়ার হোসেন, বারসিকের সহযোগী আঞ্চলিক সমন্বয়কারী রামকৃষ্ণ জোয়ারদার, পরিবেশকর্মী ওসমান গনি, নেত্রকোনার আল্পনা নাফাক, কামনা হাজং, বনজীবী শেফালী বিবি এবং যুব স্বেচ্ছাসেবক সাইদুল ইসলাম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় মানুষের কৃষি সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দেশীয় বীজ ও স্থানীয় জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঐতিহ্য ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করবে।

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

উদ্বোধনী বক্তব্যে পাভেল পার্থ বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে জাতীয় নীতিতে গুরুত্ব দিলে টেকসই জলবায়ু অভিযোজন সম্ভব।

তিনি বলেন, স্থানীয় জ্ঞানকে সামনে এনে নীতি নির্ধারক ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সংযোগ তৈরি করাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

পরিবেশকর্মী ওসমান গনি বলেন, উপকূল ও হাওর অঞ্চলে জলবায়ু সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। তবুও দেশীয় বীজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ভর করে গ্রামীণ মানুষ টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় অভিযোজন কৌশলকে শক্তিশালী করতে জলবায়ু অর্থায়ন বাড়াতে হবে এবং স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে হবে।

আয়োজকরা মনে করেন, উপকূলীয় অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কৃষি জ্ঞান, দেশীয় বীজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করার পাশাপাশি টেকসই কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় নতুন ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত