দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে পুলিশ। দেশের প্রতিটি থানাই হবে সত্যিকারের সেবাকেন্দ্র। থানায় আসা লোকজনের হয়রানি কমাতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাছাড়া আরও কিছু প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে সরকারের কাছে। ইতিমধ্যে চাঁদাবাজদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। যেকোনো কাজ করতে পুলিশকে সময় দিতেই হবে। তাড়াহুড়া করলে সফলতা আসবে না। যেমন মিডিয়ার প্রেশারের কারণে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ‘জজ মিয়ার মতো নাটক তৈরি’ করতে হয়েছে।
পুলিশ যেন এসব না করতে পারে সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেখা যাচ্ছে আন্দোলনে অংশ নেননি অথচ জুলাই বিপ্লবী সাজার চেষ্টা করছেন অনেকেই।
গতকাল সোমবার সকালে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পুলিশের নয়া মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির। আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। এই সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন, অতিরিক্ত আইজিপি (অর্থ) মো. আকরাম হোসেন, অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত আইজিপি (লজিস্টিকস অ্যান্ড অ্যাসেট অ্যাকুইজিশন) মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, অতিরিক্ত আইজিপি (ডেভেলপমেন্ট) সরদার নূরুল আমিন, ডিআইজি (রাজনৈতিক) রেজাউল করিম প্রমুখ।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যার প্রধান অসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘মিনিস্ট্র্রি থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। তারা এই বিষয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করছে, হয়তো অচিরেই আমরা তাদের বাংলাদেশে আনতে সফল হব ইনশাআল্লাহ।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি চাঁদাবাজ ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তালিকা করে অভিযানের যে ঘোষণা দিয়েছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আইজিপি বলেন, ‘আমরা ইনশাআল্লাহ অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করব। যে তালিকাটা আসছে এটা আমরা অনেক এজেন্সি থেকেই পেয়েছি। এটার সবকিছু মিলিয়ে কমন যেগুলা, সেগুলার বিরুদ্ধে আমরা অভিযান চালাব।
গত শনিবার ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অপরাধ কি না জানতে চাইলে পুলিশপ্রধান বলেন, ‘একটা বিষয় আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমাদের পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করা হবে না। কিন্তু নাগরিককে আইন মানতে হবে, আইন নিজের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। তাহলে দেশ একটা অকার্যকর দেশে পরিণত হবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পুলিশ কাজ করবে।’ তবে ‘নিষিদ্ধ সংগঠনের কেউ বিভিন্ন অজুহাতে’ রাস্তায় নেমে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটালে এবং সন্ত্রাসকে ‘উস্কে দিলে’ মেনে নেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। ‘মব সন্ত্রাসের’ বিষয়ে প্রশ্ন করলে পুলিশপ্রধান বলেন, ‘আমাদের দেশে যে আনএমপ্লয়মেন্ট আছে, এটার কারণে যে সংগঠনই কোনো প্রোগ্রামের ডাক দেয়, সেখানে লোকের সমস্যা হয় না। কিশোর গ্যাং একটা, অলরেডি তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা শুরু করেছি। বিশেষ করে মাদকের সঙ্গে রিলেটেড লোকজনই কিন্তু এই জিনিসগুলোর সঙ্গে বেশি জড়িত।’ আবার কিছু লোক ‘ফায়দা লোটার জন্য লুটপাট এবং বিভিন্ন রকমের অপকর্মের জন্য মব করে’ মন্তব্য করে আইজিপি বলেন, ‘আমরা মূল মব তৈরিকারী যারা, তাদেরও লিস্ট তৈরি করছি। সে যত ক্ষমতাবানই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
আলী হোসেন ফকির আরও বলেন, দেশে আইন মানা নাগরিকের সংখ্যা ‘কমে যাওয়াকেই’ তিনি ‘মূল চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন। ‘যেকোনো ঘটনা ঘটলে সবাই রাতারাতি বিচার চায়। এই জন্য থানাপর্যায়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে টাকা ও জমিসংক্রান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান সম্ভব। পাশাপাশি আরও বেশকিছু প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে সরকারের কাছে। পুলিশের বদলি ও পদায়নের বিষয়ে আইজিপি বলেন, সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তারা অবশ্যই মূল্যায়িত হবেন। ২ লাখ ১৫ হাজার সদস্যের এই বাহিনীকে একটি পরিবার হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যদি দুষ্ট কেউ থাকে, সে বিদায় হবে’। আর যারা সৎ, দক্ষ ও যোগ্য, তারাই বাংলাদেশ পুলিশের জন্য কাজ করবে। পুলিশের পোশাক পরিবর্তন বা আগের পোশাকে ফিরতে চাওয়ার বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, সরকার ‘পর্যালোচনা করে’ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরা হলেও তাদের নেপথ্যে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন এই বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি আপনার বাবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন?’ আইজিপি বলেন, দেশের রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি রাজনৈতিক দল। তারা পলিসিমেকার, তারা পার্লামেন্টে নীতি নির্ধারণ করে কোথায় যাবে, পুলিশ কীভাবে চলবে, সমাজ কীভাবে চলবে। তো তারা যদি ভুল করে, তারা সবাই মিলে সমঝোতার মাধ্যমে টেবিলে আলোচনা সিদ্ধান্ত নেয়, তাদেরকে কন্ট্রোল করার দায়িত্ব তো আমাদের না। কিন্তু সে যদি কোনো ক্রিমিনাল অ্যাকটিভিটিস করে বা কোনো আইন ভঙ্গ করে, সেক্ষেত্রে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
কোনো ঘটনা ঘটলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে যেটুকু সময় দরকার, পুলিশকে তা দিতে সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘মিডিয়া প্রেশারের কারণেই জজ মিয়ার মতো নাটক তৈরি হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনায় পুলিশ জজ মিয়া নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু পরে তদন্তে দেখা যায়, জজ মিয়া মূল হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তখন অভিযোগ ওঠে, আসল অপরাধীদের আড়াল করতে ‘জজ মিয়া নাটক’ সাজানো হয়েছিল। মূলত উদাহরণ হিসেবে ২১ বছর পর কথা প্রসঙ্গে ‘জজ মিয়া নাটকের’ কথার বিষয়টি সামনে আনেন। ঢাকার একটি সড়কে মাদক কেনাবেচার বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘আমাদের রেসপন্স টাইম দিতে হবে।’ তার ভাষ্য, যখন কোনো ঘটনা ঘটে, তখন সংবাদমাধ্যম এমনভাবে প্রশ্ন করে যে, এখনই এটার বিচার শেষ করতে হবে। কিন্তু কোনো কোনো হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনে ২০-২৫ বছরও লেগে যায়। আপনারা এমনভাবে প্রেশার করবেন না যেটা পুলিশের ওপর একটা মেন্টাল প্রেশারে চলে যায় এবং ওরা তড়িঘড়ি করে দেখা যায় যেটাই পায় একটা স্বীকারোক্তি নিয়ে। যাই হোক, এগুলো এখন যাতে না হয়। আইজিপি বলেন, ‘ধাপনারা দেখেন, আমি আসার পরে যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, প্রত্যেকটা ঘটনা আমরা আইডেন্টিফাই করতে সক্ষম হয়েছি। সুতরাং আপনারা সহযোগিতা করবেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন নিয়ে যারা ফায়দা লুটতে চায়, তাদেরকেও শনাক্ত করা হচ্ছে। এ আন্দোলনে নিজেও রাস্তায় ছিলেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি না।’ দেখা গেল অনেক লোক আছে জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে জড়িত ছিল না, এখন বড় জুলাই বিপ্লবী হয়ে গেছে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার পেছনে জুলাই বিপ্লবকে ‘খাটো বা ধংস করার উদ্দেশ্য ছিল’। কোনো ভালো কিছু আমরা গ্রহণ করতে চাই না। সেটাকে নষ্ট করার জন্য এই কাজগুলো করা হচ্ছে সুতরাং সাবধান। এই কথা বলে সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন আইজিপি।