সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, বর্তমানে দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারাগারে ধুঁকছে। এটি মানবাধিকারের লঙ্ঘন, দেশের বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম ব্যর্থতা, যাদের আইনের শাসন রক্ষার বিষয়ে আরও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া উচিত ছিল।
গতকাল বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ : নতুন সংসদের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম নামের একটি সংগঠন সংলাপের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সংলাপে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উপস্থিতিতে এই অবস্থার উত্তরণ প্রত্যাশা করেন রেহমান সোবহান। যেসব ব্যক্তি বেআইনিভাবে কারা হেফাজতে আছেন, তাদের সবার মানবাধিকার পুনরুদ্ধার এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদের জন্য ‘লিটমাস টেস্ট’ হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রেহমান সোবহান বলেন, দুর্ভাগ্যবশত ইতিহাস সাক্ষী যে, পূর্ববর্তী সরকারগুলো বিরোধীদের অধিকার লঙ্ঘন করে এসেছে। আবার যখন সেই বিরোধীরা ক্ষমতায় আসে, তখন তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের বিরোধীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনেই সময় ব্যয় করে।
সংলাপে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশকে আগামী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে আইন হিসেবে পাসের পক্ষে মত দিয়েছেন ৭ সংসদ সদস্য। তবে এই অধ্যাদেশে কিছু সংশোধনীর কথাও বলছেন তারা। পক্ষে মত দেওয়া সংসদ সদস্যরা হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমির ও অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিষয়টি দলের ইশতেহারেও আছে। মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের প্রায় সব বিষয়ে আমরা একমত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো সংশোধনী আনতে হতে পারে।
জাতীয় সংসদ শুরু হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সব অধ্যাদেশ আইন হিসেবে পাস করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে। এর কয়েকদিন পরে ঈদ ও জাতীয় দিবসকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ছুটি রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সেসব অধ্যাদেশ আইন হিসেবে পাস করা যাবে না, সেগুলো পরবর্তী সংসদীয় সেশনে বিল আকারে আনা যাবে। ৩০ দিনের মধ্যে সেসব অধ্যাদেশ আইন হিসেবে পাস করার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সেগুলোর মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশও রয়েছে।
৭ মার্চের ভাষণ মাইকের বাজানোর কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী আটক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, ওই ভাষণ বাজানোর জন্য একটি ছেলেকে গুরুতর আহত করা হচ্ছে। আরেকটা মেয়ে সেই ছেলেটাকে মায়ের মতো বাঁচানোর চেষ্টা করছে। এই দৃশ্য দেখে ভাবলাম আমার চোখটা অন্ধ হয়ে যাওয়া ভালো? একটা ভাষণ বাজানোর জন্য একটা ছেলেকে গুরুতরভাবে পেটাতে হবে কেন? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, সামাজিক পরিস্থিতি ও সামাজিক কালচার এটাকে আমরা উন্নত করার চেষ্টা করব। কিন্তু রাতারাতি উন্নত করা যাবে না।
তিনি বলেন, কোনো আরোপিত আদেশ আমাদের জবরদস্তিভাবে আরোপ করা হয়েছে, সেটার মধ্যে নাই। তবে জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করব। যেটা নোটস অব ডিসেন্ট দেওয়া আছে সেটার মধ্যে আমরা নাই।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, আমরা এমন একটি সমাজে বাস করছি। যেখানে নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আহমদিয়া সম্প্রদায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, শ্রমজীবী মানুষ প্রত্যেকের নাগরিক অধিকার অত্যন্ত সংকুচিত। বেশির ভাগে ক্ষেত্রে সেটা হুমকির মুখে। বম সম্প্রদায়ের কিছু মানুষকে কারাগারে রাখা হয়েছে। কোনো বিচার হয়নি। তাদের জামিন হচ্ছে না। আমরা আসলে তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানি না। দুই দিন আগেও মধুপুরে আদিবাসী সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করার জন্য হামলা চালানো হয়েছে। বাংলাদেশ ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মতো আছে, যেটা নিজেই মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। আবার এমন অনেক আইন হতে পারত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এই রকম আইন হয়নি। তিনি মনে করেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশকে আইন করার প্রয়োজন নেই। তবে মানবাধিকার অধ্যাদেশ শতভাগ আইন করার প্রয়োজন আছে।
