আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখার সুবিধার্থে যেমন বিভিন্ন জোন বা সার্কেলে বিভক্ত থাকে তেমনি অপরাধমূলক কাজ করার জন্য অপরাধীদেরও আছে পৃথক জোন আর এলাকা। বিশেষ করে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ করতে হলে ঢাকা শহরের নির্ধারিত একটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে এ ধরনের কাজ করতে নিতে হয় অনুমতি। ওই এলাকার অপরাধীদের ছিনতাইয়ের কমিশনও দিতে হয় ।
রাজধানীতে প্রায় প্রতিটি এলাকায়ই আলাদা আলাদা ছিনতাইকারীদের গ্রুপ সক্রিয়। স্থানীয় ‘প্রভাবশালীদের’ ছত্রছায়ায় থেকেই ঘটায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ছিনতাইকারীদের পুলিশ-আদালতে ঝামেলাও দেখেন তারা।
পুলিশের এক ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা বলেন, একজন ফৌজদারী মামলার আসামিকে জামিন করার ক্ষেত্রে আদালত অভিভাবক খোঁজে। এ সময় আইনজীবী ও একজন স্থানীয় ব্যক্তির জিম্মায় তাদের জামিন দেয়। আর বিভিন্ন এলাকার কথিত ওই প্রভাবশালীরাই তাদের জামিনদার হন।
ঢাকার কোন এলাকায় কারা সক্রিয় : ঢাকা শহরে ছিনতাই করার ক্ষেত্রে কার কোন এলাকা তার একটি তালিকায় দেখা যায়, রাজধানীর ব্যাংক পাড়া, বাণিজ্যিক এলাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয়। এসব গ্রুপের সদস্যও একাধিক। তবে তারা এক সঙ্গে ছিনতাই করে কম। যে যার মতো চুরি ও ছিনতাই করে।
পুলিশ তথ্য অনুসারে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় ছিনতাইকারীর সংখ্যা বেশি। হিরু মিয়া, জামাল হোসেন বাপ্পী ওরফে কার্টুন, রবিউল হোসেন, মো. রিয়াদ, মো. রাশেদ, হৃদয় ওরফে রাজা, মোবারক হোসেন ও সামীর হোসেন ওরফে রাজুসহ ১৩১ জন ছিনতাইকারী রয়েছে। তাদের নামে একাধিক মামলা রয়েছে। এছাড়া তারা ঢাকার অন্যান্য থানায়ও গ্রেপ্তার হয়েছে।
কমলাপুর, খিলগাঁও ও মালিবাগ রেলগেট এলাকায় ছিনতাই করে মো. বাবুল, রাজিব আহম্মেদ আলামিন, বিল্লাল হোসেন, বাদল সরকার, আব্দুর জব্বার, রফিক ব্যাপারী, বিল্লাল ওরফে শাওন গাজী, জসিম মাতুব্বর ও জাকির হোসেন। এই এলাকায় ভাসমান ছিনতাইকারীরা হলো মো. রনি, মো. রাসেল, মনির হোসেন, মো. ইসমাইল ও মো. তারেক।
সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ড এলাকায় ছিনতাই করে আসলাম মিয়া, মো. জনি, মো. রাসেল, নাইট সোহেল, মো. মিলন, পিচ্চি জনি, মো. শাহিন, মো. মিন্টু, মো. সজল, মো. আলী আশরাফ জুয়েল, কৌশিক সরদার, শাহিন আলম, মো. মহিউদ্দিন, ফারুক হোসেন, মো. বাবুল, মো. লিটন, আনোয়ার হোসেন ওরফে মোতালেব, নুর আলম ওরফে মদন ও নুর হোসেন।
যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় ছিনতাই করে মো. জসিম, মো. হাফিজুল, খায়রুল ইসলাম, মো. সুমন, শিরু মাদবর, যোগনী সুমন, আরিফুল ইসলাম ওরফে বোমা আরিফ, মো. জসিম, পারভেজ হাওলাদার, মো. আলমগীর ও আলমগীর মিয়া।
ডেমরা সাইনবোর্ড এলাকায় ছিনতাই করে রিফাত ভূঁইয়া, ওমর ফারুক, শরিফুল ইসলাম, মেহেদী হাসান শুভ, সোহেল, সবুজ, শাহিন ওরফে শাকিল ও সোহেল।
রামপুরা এলাকায় ছিনতাই করে মনির হোসেন সোহাগ ওরফে সাগর, ইউসুফ খান, আজিজ, মাহবুব আলম, গণেশ চন্দ্র বণিক, আজিজুল শেখ, শাহিন, জসিম মাতব্বর, রিয়াদ হোসেন, সুজন, শওকত হোসেন রানা, মনসুর আহমদ রিমন, রনি হাওলাদার, আব্দুর রহমান বাচ্চু ওরফে ট্যাবলেট বাচ্চু, শাহীন, আবুল হোসেন, রুবেল, ওমি, রিমন ওরফে লিওন, আশিকুর রহমান, শরীফ ওরফে সোহাগ ওরফে সজীব ও রাসেল।
পোস্তগোলা ব্রিজের ঢালে ছিনতাই করে কাজল ও হানিফ। জুরাইন কবরস্থান এলাকায় ছিনতাই করে মামুন, সোহেল মার্ডার সোহেল, সুজন ও আরমান। গুলিস্তান নাট্যমঞ্চ ও বিআরটিসি বাস কাউন্টার এলাকায় ছিনতাই করে ইদ্রিস আলী, মাসুদ, সাগর ইয়াসিন, শান্ত গলাকাটা শান্ত, শাহীন, শামীম ওরফে মুরগি শামীম, লালন মিয়া, ইয়াসিন রানা ও সোহেল ওরফে কালু সোহেল।
মুগদা স্টেডিয়াম এলাকায় ছিনতাই করে শুকুর, সাগর হোসেন, মাসুম খান, মিহির তালুকদার, সাজ্জাদ হোসেন, রিয়াজ ও রিয়াজুল ইসলাম শাওন।
বংশাল, তাঁতিবাজার ও ফুলবাড়ি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছিনতাই করে শাওন, ফারুক, জয়, ইয়াসিন হোসেন রাজু, কোহিনুর বেগম মালা (ছিনতাইকারীরা মালামাল জমা করে এই মালার কাছে), লোকমান পাঠান, সুলতান হিমেল, হৃদয়, সুমন, সাগর, সাব্বির, কায়সার বাপ্পি, জনি, আব্দুর রহমান, সামির, রাশেদ, হৃদয় ওরফে নিরব, শেখ মিলন, রফিকুল ইসলাম, জুয়েল হাওলাদার, রানা ওরফে জুমন হাওলাদার, অধরা আক্তার সুমি, শাহাবুদ্দিন, সীমা আক্তার নাজমা, রহমান আন্তা, সেলিম ওরফে তালু ছোলা সেলিম, রজন মিয়া, সাব্বির হোসেন সুমন ও জাহাঙ্গীর সাইকেল। নয়াবাজার জিন্দাবাদ এলাকায় ছিনতাই করে বাবু মিয়া, ইমরান, ওমর ফারুক, গাজী ও মুন্না।
হাতিরঝিল এলাকায় ছিনতাই করে নাহিদুল ইসলাম, আবু সাঈদ, মাসুম, রতন, রাজিব, জনি, মোহাম্মদ হোসেন ওরফে আকাশ ও আশিক সরদার।
লালবাগ ও চকবাজারে এলাকায় ছিনতাই করে সাব্বির, ইমরান, আল আমিন ও তুহিন। এছাড়া সায়মন, সাব্বির, আকাশ মিরাজ, কালু ওরফে গ্রেনেট কালু, মিরাজ হোসেন, আরিফ হোসেন, ইমন, হান্নান ও শাওন।
ধানম-ি এলাকায় ছিনতাই করে আবুল হোসেন, কাউসার, রমজান মিয়া, মুন্নাফ, আলামিন, আলম, বিশাল, ফুলবাবু, চান মিয়া ও সুমন।
নিউ মার্কেট এলাকায় ছিনতাই করে রাজু, সাগর, রাসেল, তোফাজ্জল হোসেন, অলি, মেহেদী, রাব্বি, সেলিম, ইসমাইল ও সোহেল। খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছিনতাই করে এনামুল, রাসেল, নয়ন ও ইয়াসিন।
মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছিনতাই করে আকাশ মিয়া, মামুন, রনি, সোহেল, সুজন, আকরাম হোসেন ও শাকিল ইসলাম। এছাড়া বনানী বাসস্ট্যান্ডে এলাকায় ছিনতাই করে রবিন হোসেন বাদল, ডিপজল হোসেন আবুল হোসেন ও বিল্লাল হোসেন।
মিরপুর শেওড়াপাড়া এলাকায় ছিনতাই করে আমিনুল ইসলাম স্বপন, নুরুজ্জামান, স্বপন মিয়া, ফারুক হোসেন ওরফে রনি, সোহেল মেহেদী হাসান ওরফে রাসেল মিয়া, মাহবুবুর রহমান ওরফে চৌধুরী সুমন, খলিলুর রহমান ওরফে খলিল, বাবু ওরফে পেজগী বাবু, সালমা ওরফে তাসলিমা আক্তার, সোহেল মিয়া, আল আমিন, আসাদুজ্জামান শুভ, সবুর আলী, মেহেদী হাসান পরান ও সাগর।
বিমানবন্দর এলাকায় ছিনতাই করে বাপ্পি শেখ-সহ তারা আট সহযোগী। কাওরান বাজার সোনারগাঁও ক্রসিং ও সিএ ভবনের সামনে ছিনতাই করে শরীফ, সাব্বির, রাসেল, মেহেদী হাসান ওরফে সালমান শরীফ, জনি আহমেদ ও ইমন ইসলাম মাহমুদ মাসুদ।
তেজগাঁও রেল স্টেশন এলাকায় ছিনতাই করে হাফিজ উদ্দিন, শফিকুল ইসলাম, সোহেল, সাইফুল ইসলাম মিশু, সজিব খান নয়ন, আরিফ, সুমন ওরফে কালু সুমন, রানা, সোহাম, সাগর, রনি ও ইব্রাহিম। এ ছাড়া বসুন্ধরা শপিং সেন্টারের সামনে ছিনতাই করে নূর আলম ওরফে রাকিব ও শামসুদ্দিন মুন্না।
ডিএমপির মুখপাত্র উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএমপির যে থানায় যার নামে বেশি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে এবং ওই এলাকায় থাকেন সাধারণত তাকে ওই এলাকার ছিনতাইকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে জামিনের পর তাদের মনিটরিং করতেও পুলিশের সুবিধা হয়।
এছাড়া অপরাধীদের শনাক্ত করতে সাসপেক্ট আইডেনটিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেমও (এসআইভিএস) বেশ কাজ দিচ্ছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, আগে অপরাধীরা যত বার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হতেন, তত বার ভিন্ন নাম ব্যবহার করে পূর্বের অপরাধ ঢাকতেন। এতে তাদের নামে মামলার সংখ্যা জানা যেত না। তবে ২০১৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এসআইভিএস ভা-ারে একজন অপরাধীর ছবি, আঙুলের ছাপ ও অপরাধের পূর্ণ তথ্য রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তার ছবি বা আঙুলের ছাপ নিলেই তার বিষয়ে জানা যায়।
তবে টানা পার্টির সদস্যরা যে কোনো এলাকায় ছিনতাই করেন বলেন জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, তাদের বিষয়েও সতর্ক পুলিশ।
