ঈদযাত্রা যেন মরণযাত্রা না হয়

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৮:০৫ এএম

দীর্ঘদিন পর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা, শৈশবের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়া, প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া ঈদ মানেই তো সেই নাড়ির টানে ফেরা। এই ফেরা নিয়েই কত কিছু মায়ের শাড়ি, বাবার পাঞ্জাবি, সন্তানের জামা, কেনাকাটায় ভিড়, তারপর আবার বাস, ট্রেন ও লঞ্চে টিকিটের লাইন। তারপরও থেকে যায় নির্বিঘ্নে শেকড়ে ফেরা নিয়ে সন্দেহ। আনন্দের যাত্রা অনেক সময়ই পরিণত হয় বিষাদে, শোকের মিছিলে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, বিষয়টি নিয়ে ততই উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্টদের মনে। মহাসড়কে ছোট-বড় নানা শ্রেণির গাড়ির বাড়তি চাপ, বেপরোয়া গতি, বেশি আয়ের উদ্দেশ্যে নির্ঘুম চালক, দীর্ঘ যানজট ও যাত্রীদের তাড়াহুড়ায় ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। পরিসংখ্যান বলছে, এবারের ঈদুল ফিতরের ঢাকা থেকে প্রায় দেড় কোটি মানুষ গ্রামে যাবেন। ঈদের আগে কম ছুটি থাকায় দিনে গড়ে ৫০ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়বে। শেষ মুহূর্তের ছুটিতে মহাসড়কে ভিড় বাড়ে আরও। ছোট-বড় যেকোনো যানবাহনে চড়ে ছুটে চলেন যাত্রীরা। তবে ঈদ কেন্দ্র করে সব থেকে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হন মোটরসাইকেল আরোহীরা। অল্প করে হলেও ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে ঈদযাত্রা। সড়কে দুর্ঘটনার খবরও আসছে প্রতিদিন।

বিভিন্ন সংগঠনের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঈদ ভ্রমণের সময় সড়ক দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে ১৫ দিনে (২৪ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল) ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৩২২ জন, আহত হয়েছে ৮২৬ জন যাত্রী। দুর্ঘটনার শীর্ষে ছিল মোটরসাইকেল। ১৩৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১৫১ জন ও আহত হয় ১৫৫ জন আরোহী। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার না করার প্রবণতা এই দুর্ঘটনাগুলো আরও প্রাণঘাতী করে তুলে বলেও মনে করেন একাধিক সংগঠনের গবেষকরা।

তবে এবারের ঈদযাত্রা কেন্দ্র করে পুলিশ সদর দপ্তর, সব মেট্রোপলিটন পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, রেঞ্জ পুলিশ ও নৌপুলিশের বিশেষ নজরদারি রয়েছে। মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অটোরিকশা, ভ্যান, মাহেন্দ্রসহ সব ধরনের ছোট গাড়ির দিকে বিশেষ নজর রাখবে পুলিশ। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর ঈদযাত্রায় একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে। বেসরকারি কয়েকটি সংগঠনও বাস মালিক সমিতিকে এবং চালককে অনেকগুলো নিয়মনীতি মেনে চলার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। তবে যাত্রীদের তাড়াহুড়া ও বেপরোয়া হয়ে ওঠাকেও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ : ঈদ মৌসুমে হঠাৎ করে সড়কে গাড়ির চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাই এ সময়ের জন্য আলাদা নিরাপত্তা পরিকল্পনা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ঈদের আগে মহাসড়কে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা, দীর্ঘপথে চালকদের বিশ্রামের সুবিধা, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এ ছাড়া যাত্রীদের কিছু নিয়ম মেনে চলার কথাও বলেন বিশেষজ্ঞরা। সেগুলো হলো গতিসীমা মেনে চলা, চালককে অসুস্থ মনে হলে বিশ্রামের জন্য বলা, তাড়াহুড়া না করা, মোটরসাইকেলে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করা, সর্বোপরি যাত্রীদের সতর্ক থাকা। তাদের মতে, সবাইকে মনে রাখতে হবে ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আমরা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারি। প্রতিটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয় না, একটি পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

বেশি ঝুঁকি মোটরসাইকেলে : বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। শহরের যানজট এড়াতে এবং দ্রুত যাতায়াতের জন্য অনেকেই মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। ঈদযাত্রায় তরুণদের একটি বড় অংশ বাড়ি ফিরবেন মোটরসাইকেলে। দীর্ঘ এই যাত্রায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয় মোটরসাইকেল আরোহীদের। নিরাপত্তাসচেতনতার অভাব এবং নিয়ম অমান্য করার প্রবণতায় মহাসড়কে অন্য যানবাহনেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেন মোটরসাইকেল চালকরা।

আইন থাকলেও বাস্তবে নেই : বাংলাদেশে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২০১৮ সালে রোড ট্রান্সপোর্ট আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত গাড়ি চালিয়ে কারও মৃত্যু ঘটালে কারাদন্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন পরিচালনা, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো এসবের জন্যও শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, আইন থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিতভাবে দুর্ঘটনা কমেনি। কারণ আইন প্রয়োগ দুর্বল, মনিটরিং সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে শাস্তির বাস্তব প্রয়োগ অনিয়মিত। ফলে অনেক চালকই এখনো মনে করেন যে নিয়ম ভাঙলেও তার তেমন কোনো সমস্যা হবে না।

হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (অপারেশনস-উত্তর) মো. রফিকুল হাসান গণি বলেন, মহাসড়কে যেসব যানবাহন অবৈধ, সেগুলো সড়কে উঠতে পারবে না। আর যানবাহনের জন্য মহাসড়কের যে আইনগুলো রয়েছে, সেগুলো চালকরা মেনে চলবেন। আইন মেনে চললে সড়কে সবার চলাচলই ভালো হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একগুচ্ছ পরিকল্পনা : ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘœ করতে দেশবাসীর জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। পুলিশের পক্ষ থেকে যাত্রীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, ঈদের ভ্রমণ পরিকল্পনা পর্যাপ্ত সময় নিয়ে করতে হবে এবং যাত্রাকালে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। চালককে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে চাপ না দেওয়ার পাশাপাশি বাসের ছাদে কিংবা ট্রাক, পিকআপসহ পণ্যবাহী যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে জেব্রা ক্রসিং বা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেখানে এসব সুবিধা নেই, সেখানে যানবাহনের গতি পর্যবেক্ষণ করে সতর্কতার সঙ্গে রাস্তা পার হতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে পুলিশের সহায়তা নেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।

বাসচালকদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং থেকে বিরত থাকতে হবে। ক্লান্তি, অসুস্থ অবস্থায় গাড়ি না চালানো, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখা এবং বাসে অতিরিক্ত যাত্রী না তোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে চলাচলের সময় পুলিশের নির্দেশনা মেনে চলার কথাও বলা হয়েছে।

নৌপথে যাত্রীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চ, স্টিমার বা স্পিডবোটে না ওঠা এবং নৌযানের ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌপথে ভ্রমণ না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্পিডবোটে ভ্রমণের সময় লাইফ জ্যাকেট পরার আহ্বান জানানো হয়েছে।

নৌযান মালিকদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত গ্রেডের মাস্টার ও ড্রাইভার দ্বারা নৌযান পরিচালনা করতে হবে এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌযান চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। পাশাপাশি মাস্টার ব্রিজে যাত্রীদের অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা এবং পর্যাপ্তসংখ্যক বয়া ও লাইফ জ্যাকেট রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ট্রেনযাত্রীদেরও সতর্ক করে বলা হয়েছে, ট্রেনের ছাদ, বাফার, পাদানি বা ইঞ্জিনে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে। ভ্রমণের সময় পাথর নিক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং মালামাল নিজের দায়িত্বে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

যেকোনো প্রয়োজনে সহায়তার জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের কন্ট্রোল রুমে ০১৩২০০০১৩০০ ও ০১৩২০০০১২৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। এ ছাড়া হাইওয়ে পুলিশ (০১৩২০১৮২৫৯৮), রেলওয়ে পুলিশ (০১৩২০১৭৭৫৯৮), নৌপুলিশ (০১৩২০১৬৯৫৯৮) এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) (০১৭৭৭৭২০০২৯) নম্বরে যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে জেলা পুলিশ সুপার বা সংশ্লিষ্ট থানার ওসির সঙ্গেও যোগাযোগ করা যেতে পারে।

‘লক্কড়ঝক্কড়’ বাসে বিশেষ নজরদারি : ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার বলেছেন, সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ হলো ফিটনেসবিহীন ‘লক্কড়ঝক্কড়’ বাস। এই বাসগুলো হাইওয়েতে নষ্ট হয়ে গেলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ঈদের এ সময়ে যেন এসব বাস রাস্তায় নামতে না পারে, সেজন্য বিআরটিএ এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। গত শুক্রবার (১৩ মার্চ) এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিকেলে রাজধানীর গুলিস্তানে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান এবং চালক ও মালিক সমিতির সঙ্গে বৈঠক করেন ডিএমপি কমিশনার। এর আগে একই দিন সকালে রাজধানীর উত্তরায় লক্কড়ঝক্কড় বাস প্রতিরোধে বিভিন্ন মোটরযান ওয়ার্কশপে ডিএমপির মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।

বাস মালিক সমিতির সঙ্গে এক বৈঠকে ডিএমপি কমিশনার বলেন, বাস টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, এসবি এবং র‌্যাব মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া সন্দেহভাজন বস্তু তল্লাশিতে ডগ স্কোয়াড এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে সোয়াট টিম প্রস্তুত থাকবে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে মাউন্টেন পুলিশও (অশ্বারোহী) দায়িত্ব পালন করবে।

ডিএমপি কমিশনার মালিক ও শ্রমিক সমিতিকে অনুরোধ করে বলেন, চালকরা যাতে একটানা ৪-৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালান এবং যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী না তোলেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত