ইরানের হৃদয় ‘খার্গ দ্বীপ’

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৮:০০ এএম

ইরানের খ্যাতনামা কবি জালাল আল এ আহমাদ একদিন তার নাম দিয়েছিলেন ‘পারস্য উপসাগরের অনাথ মুক্তা’। তিনি আসলে বলেছিলেন ইরানের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ খার্গের কথা। পারস্য আমল থেকেই দ্বীপটি ছিল অনেকটা বিচ্ছিন্ন অথচ মূল্যবান এক মুক্তোর মতো। আজও বুশেহর প্রদেশের এই ২২ বর্গকিলোমিটার (৮.৫ বর্গমাইল) বিস্তৃত প্রবালভিত্তিক দ্বীপটি ইরানিদের কাছে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ হিসেবে পরিচিত। ভীষণ গোপনীয়তার আবরণে ঢাকা ও ইরানের অভিজাত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কড়া পাহারায় থাকা এই দ্বীপে প্রবেশের অনুমতি রয়েছে শুধু তাদেরই, যাদের কাছে সরকারি নিরাপত্তা ছাড়পত্র আছে। বিশাল ইস্পাতের বেড়া ও সামরিক নজরদারি টাওয়ারের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মহাযজ্ঞ। সেখানে আছে যুগ যুগ ধরে মাটির বুকে সঞ্চিত বিশাল এক জ্বালানি সাম্রাজ্য। গতকাল শনিবার খার্গ দ্বীপ আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়ে ইরানের এই দ্বীপের সামরিক স্থাপনাগুলোতে বিমান হামলা চালিয়েছে। ফলে দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের সর্বশেষ কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশালে লিখেছেন, শালীনতার খাতিরে আমি দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিইনি। তবে যদি ইরান বা অন্য কেউ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের মুক্ত ও নিরাপদ পথ বাধাগ্রস্ত করার মতো কোনো কাজ করে, তাহলে আমি অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।

বুশেহর বন্দরের উত্তর-পশ্চিমে ৫৫ কিলোমিটার ও ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১৫ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২৮ কিলোমিটার) দূরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির অবিসংবাদিত ভিত্তি। দ্বীপটির মাধ্যমে দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত ও পরিবহন করা হয়। প্রতি বছর এখানে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের বাণিজ্য হয়। মাত্র ৮ কিলোমিটার (৫ মাইল) লম্বা ও ৪-৫ কিলোমিটার (২.৫-৩ মাইল) চওড়া এই দ্বীপের চারপাশের গভীর সমুদ্র তাকে একটি স্বাভাবিক ভৌগোলিক সুবিধা দিয়েছে। এই গভীরতার কারণে বিশালাকার সুপারট্যাংকার সহজেই এখানে নোঙর করতে পারে এবং প্রধানত এশিয়ার বাজারের উদ্দেশে অপরিশোধিত তেল বোঝাই করতে পারে। এই বাজারে চীনই ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক। ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটির স্থাপনাগুলো এই খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানে আবুজার, ফরুজান ও দোরুদ এই তিনটি বড় অফশোর তেলক্ষেত্র থেকে অপরিশোধিত তেল আসে। পরে জটিল সমুদ্রতল পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেগুলো স্থলভাগের প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর সেগুলো সংরক্ষণ করা হয় বা বৈশ্বিক বাজারে পাঠানো হয়। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল উৎপাদন বারবার বাধাগ্রস্ত হলেও ইরান দ্বীপটির অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে এসঅ্যানইপ গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটস জানায়, তেহরান টার্মিনালের সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়াতে ট্যাংক নম্বর ২৫ ও ২৬ পুনর্বাসনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ২০ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতা যুক্ত করেছে। প্রতিটি ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ১০ লাখ ব্যারেল।

ঐতিহাসিকভাবে, ক্রমাগত উন্নয়ন করা এই টার্মিনালগুলোর সর্বোচ্চ লোডিং ক্ষমতা প্রতিদিন ৭ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। যদিও বর্তমানে ইরানের জাতীয় তেল রপ্তানি দৈনিক প্রায় ১.৬ মিলিয়ন ব্যারেলের কাছাকাছি রয়েছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্যও উৎপাদন পরিচালনা করা হচ্ছে। দ্বীপটির কৌশলগত সামুদ্রিক গুরুত্ব বহু আগেই বিজেতাদের লোভের বস্তুতে পরিণত করেছিল; হাইড্রোকার্বনের আবিষ্কারেরও অনেক আগে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় উপভাষা ও ইউরোপীয় মানচিত্রে দ্বীপটির নাম নানা রূপে দেখা গেছে। কোথাও খার্গ, খার্ক, খারাজ ও খারেজ। দ্বীপটির প্রাকৃতিক মিঠা পানির ঝরনা এবং কৌশলগত অবস্থান এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংযোগস্থলে পরিণত করেছিল, যার মাধ্যমে কৃষিপণ্য ও খনিজ রপ্তানি সহজ হতো। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগে প্রথমে পর্তুগাল উপসাগরের অন্যান্য দ্বীপের সঙ্গে খার্গের নিয়ন্ত্রণও দখল করে। পরে আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে নেদারল্যান্ডসের ঔপনিবেশিক আকাক্সক্ষাও এখানে শিকড় গাঁথতে শুরু করে। ১৭৫২ সালে ডাচ ব্যারন নিফাউসেন মীর নাসের আল-জাবির সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। মীর নাসের আল-জাবি তখন বান্দার রিগের শাসক ছিলেন। এই চুক্তির মাধ্যমে সেখানে একটি বাণিজ্যিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। পরের বছর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করে।

তবে এই ঔপনিবেশিক উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কয়েক বছর ধরে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বন্দার রিগের গভর্নর মীর মুহান্না ১৭৬৬ সালের জানুয়ারিতে দুর্গটির ওপর সফল আক্রমণ চালান এবং শেষ পর্যন্ত ডাচ বাহিনীকে সেখান থেকে বহিষ্কার করেন। বিশ শতকে এসে দ্বীপটির ইতিহাস এক অন্ধকার অধ্যায়ে প্রবেশ করে। রেজা শাহ পাহলভী ১৯২৫ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ইরানের শাহ ছিলেন। দ্বীপটিকে রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য একটি দূরবর্তী নির্বাসনস্থলে রূপান্তর করেন তিনি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে

দ্বীপটির বৃহত্তর সম্ভাবনা প্রায় অনাবিষ্কৃতই থেকে যায়। প্রকৃত অর্থে আধুনিক তেল যুগের সূচনা হয় ১৯৫৮ সালের পর।

তারপর ধীরে ধীরে তার সেই কঠোর কারাগার অতীত ঝেড়ে ফেলে খার্গকে একটি বিশাল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন গভীর সমুদ্র টার্মিনাল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় এবং ১৯৬০ সালের আগস্টে এখান থেকে প্রথম বড় তেল চালান পাঠানো হয়। ষাটের দশকে যখন অফশোর তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হতে থাকে, তখন খার্গ দ্রুতই আবাদান বন্দরের গুরুত্বকে ছাপিয়ে যায়। বিশাল তেলবাহী ট্যাংকারগুলো তখন এর গভীর জেটিতে এসে ভিড়তে শুরু করে। দ্বীপটির আধুনিক শিল্পায়িত চেহারার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রতœতাত্ত্বিক ঐশ্বর্য। এখানে মানুষের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষ দিক থেকেই। সেই সময় থেকে শুরু করে এলামাইট সাম্রাজ্য, আক্কাদিয় ও সাসানিক সাম্রাজ্য। এই তিন যুগের বিভিন্ন নিদর্শন এখানে পাওয়া গেছে। দ্বীপটি ধর্মীয় ও

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে অবস্থিত একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কবরস্থানে বিভিন্ন ধর্মের নিদর্শন দেখা যায়। সেখানে জরথুস্ত্রী সমাধিস্থল, খ্রিস্টান কবর ও সাসানীয় যুগের সমাধি পাশাপাশি অবস্থান করছে। দ্বীপ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে আরও বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন। যেমন ১৭৪৭ সালের ডাচ ফোর্টের ধ্বংসাবশেষ, ডাচ গার্ডেন, খার্গ অর্চার্ড, একটি পুরনো রেললাইন, ইসলামি কবরস্থান এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিলালিপি। এই শিলালিপির আকার ৮৫ বাই ১১৬ সেন্টিমিটার (৩৩ বাই ৪৬ ইঞ্চি) এবং এটি ‘পারস্য উপসাগর’ নামটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রাচীনতম প্রতœতাত্ত্বিক দলিলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।

খার্গ দ্বীপ তার ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে বহু ক্ষতের সাক্ষী। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দ্বীপটি বারবার ভয়াবহ বোমা হামলার শিকার হয়েছিল। পরে ইরানি কর্র্তৃপক্ষ ধীরে ধীরে সেটিকে পুনর্গঠন করে। আজও যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রায়ই এ অঞ্চলের জলপথকে অস্থির করে তোলে, তখন দ্বীপটি কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। ফলে পর্যটকদের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। আর এ কারণেই অনিচ্ছাকৃতভাবে এর প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেকটাই অক্ষত থেকে গেছে।

এদিকে বিশাল সুপারট্যাংকারগুলো যখন নীরবে উপসাগরের গভীর জলে পাড়ি দেয়; একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশের অর্থনীতির প্রাণরস বহন করে। তখন প্রবাল তীরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন জরথুস্ত্রী ও খ্রিস্টান কবরগুলো নীরবে সেই দৃশ্যের সাক্ষী থাকে। যেন তারা স্মরণ করিয়ে দেয়, সাম্রাজ্য ও জ্বালানি যুদ্ধ সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, কিন্তু ‘অনাথ মুক্তা’ খার্গ দ্বীপ চিরকালই ইতিহাসের অস্থির জোয়ারের সঙ্গে বাধা পড়ে থাকবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত