ঐতিহাসিক ১৯ দফা কর্মসূচি

টেকসই উন্নয়নের বদ্বীপ-মডেল

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৮ এএম

বর্তমান সরকার ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা প্রদানে ধারাবাহিক সাফল্য প্রদর্শনই হওয়া উচিত এ সরকারের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঠিক ধারা থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জিয়ার ১৯ দফার গুরুত্ব অনুধাবন ও এর আলোকে বিএনপির ৩১ দফার বাস্তবায়নই হতে পারে বিদ্যমান সংকট ও আসন্ন বিপর্যয় থেকে দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করার কার্যকর উপায় (শেষাংশ) সংস্থাটি ৬ জুলাই ১৯৭৯ সালে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর উদ্যোগে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং অন্যান্য জাতিসংঘ সংস্থা এবং দাতাদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সংস্থাটির সদর দপ্তর ঢাকায় স্থাপন করানোর ক্ষেত্রেও তিনি সফল হন। রুরাল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি (RDA) গঠন করে নবায়নযোগ্য মডেল তথা রেপ্লিকেবল মডেলের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও তিনিই চালু করেন। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে ঠাঁই দিয়েছিল গ্রাম। করোনাকালে গ্রাম আবার নিজেকে প্রমাণ করেছিল। মাতৃসম গ্রামের গুরুত্ব উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে জিয়ার বোধ ছিল তুলনাহীন। এটি SDGs-এর এগারোতম লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দশম দফায় তিনি জোর দিয়েছেন সবার জন্য ন্যূনতম চিকিৎসাব্যবস্থা করার ওপর। ২৭৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ করে গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি করেছেন। এটি SDGs-এর চতুর্থ লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি ১৯৭৮ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিটে অংশগ্রহণ করেন এবং সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেশ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি বিরতিহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়া জনসংখ্যাকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সংকটের অন্যতম একটা কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং এই সংকট মোকাবিলায় জাতীয় জনসংখ্যা নীতি ঘোষণা করেন। এই নীতির অধীনে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

পরিবার পরিকল্পনা সেবার সঙ্গে শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে সমন্বিত করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। নারী প্রতি যেখানে সন্তান জন্ম দেওয়ার হার ছিল ৭, সেখান থেকে তিনি ২ থেকে ৩-এর মধ্যে নামিয়ে আনেন। তিনি যদি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের এই কার্যক্রম গ্রহণ না করতেন তাহলে বাংলাদেশের মাথাপিছু গড় আয় বর্তমানের এক-তৃতীয়াংশ হতো। অর্থাৎ ৬০০ ডলারের কাছাকাছি হতো, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান কিংবা আফগানিস্তানের সমান হতো। আইসিডিডিআরবিকে গবেষণার ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। তার পৃষ্ঠপোষকতায় আইসিডিটির স্যালাইন নামক একটি সহজলভ্য তরল পানীয় ওষুধ আবিষ্কার করার মাধ্যমে লাখ লাখ ডায়রিয়া আক্রান্ত মানুষের জীবনরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। বারডেম হাসপাতাল, শিশু হাসপাতা ও চক্ষুবিজ্ঞানে ইনস্টিটিউট স্থাপন করেছেন। এ প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষায়িত চিকিৎসক তৈরি করার পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা অর্জন করেছে। সুতরাং আলোচনা থেকে তৃতীয় মনে হয় যে, বাংলাদেশ যে কয়টি সূচকে মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে সেগুলো সূচনা হয়েছে জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই। অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য তিনি বিদেশে জনশক্তি প্রেরণ করার মাধ্যমে রেমিট্যান্স অর্জন এবং নিজ দেশে বস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে অপার সম্ভাবনাময় তৈরি পোশাক শিল্পের সূচনা । এভাবে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি তলাবিহীন ঝুড়িতে রূপান্তরিত করা বাংলাদেশকে উন্নয়নের পথে ধাবিত করেছিল। সময় স্বল্পতার কারণে প্রত্যেকটি দফা আলাদা আলাদা করে আলোচনার সুযোগ নেই। তার এই উন্নয়ন কর্মসূচি একদিকে যেমন টেকসই অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল তেমনিভাবে বাংলাদেশের ভূবৈচিত্র্যের বিবেচনায় ছিল পরিবেশবান্ধব। এটি SDGs-এর অষ্টম লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার ১৯ দফা কর্মসূচির উন্নয়ন পরিকল্পনা এদেশের বাস্তুব্যবস্থা ও জলাভূমি- সভ্যতার আদলে প্রণয়ন করার সুবাদে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের এক নবযুগের সূচনা হয়। ঝউএং-এর উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাগুলোর অন্যতম একটি বিবেচ্য বিষয় হলো, পরিবেশ সুরক্ষা করে উন্নয়ন নিশ্চিত করা। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করা যায় যে, বিশ্ববাসী টেকসই উন্নয়নের ধারণা অবহিত ও বাস্তবায়নের বহু পূর্বেই জিয়ার ১৯ দফার কল্যাণে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের এক ‘বদ্বীপ-মডেল’ পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে। জিয়ার শাসনামলে এবং পরবর্তী সময় তার প্রণীত মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তিনবার সরকার পরিচালনা করার সুবাদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়।

পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, গুটিকয়েক সূচকে অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বলা হয়, উন্নয়নশীল বাংলাদেশ উন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করতে যাচ্ছে। আসলে কি তাই? মূলত গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে উন্নয়নের নামে বাংলাদেশে মেগা প্রকল্পের ঋণ ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে । ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফাঁদে জড়িয়ে পড়া পার্শ্ববর্তী দেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার দিকে তাকালে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শ্রীলংকা ছিল মধ্যম আয়ের একটি দেশ। কিন্তু বাণিজ্যিক শর্তে চীনের দেওয়া ঋণের অর্থে বন্দর ও মহাসড়কের মতো বড় প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় শ্রীলংকার উন্নত দেশে রূপান্তরিত হওয়ার স্বপ্ন মুখ থুবরে পড়েছে। ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় গভীর সমুদ্রবন্দর হাম্বানটোটাকে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছে। উক্ত উৎস থেকে রাজস্ব আয়ের ৯০ শতাংশ চলে যাচ্ছে চীনের ঋণের দায় শোধ করতে। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার অবস্থা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে তা বিশবাসী সবার জানা। চোখের সামনে এমন সম্ভাবনাময় একটি দেশ দেউলিয়া হয়ে গেল। পাকিস্তানের অবস্থাও একই দিকে ধাবিত হচ্ছে। বড় প্রকল্পগুলো বিশ্বব্যাংক ও চীনের বিনিয়োগনির্ভর। যেমন চীনের ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে পাকিস্তানে পাঁচটি জলবিদ্যুৎ নির্মাণ কাজ চলমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঋণ শোধ করতে ৪০ বছর সময় লাগবে। নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হতে বিলম্ব হওয়ায়, এই ব্যয় ৯৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়াতে পারে এবং এক বছরে এই ঋণের সুদ ৫ বিলিয়ন ডলার হারে বিশ বছরে দাঁড়াবে ২০০ বিলিয়ন ডলারে। পাকিস্তান সরকারের এই ঋণের বোঝা জনগণকে বছরের পর বছর বহন করতে হবে। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের অনুরূপ বাংলাদেশও ঋণ ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের আপামর জনতা বছরের পর বছর এই ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সরকার ঋণ করে উচ্চ ব্যয়বহুল প্রকল্প, ব্যক্তি গোষ্ঠীর স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ নিয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগের সুবিধাভোগী দেশি-বিদেশি কিছু গোষ্ঠী। কিন্তু সেগুলো একদিকে পরিশোধের চাপ আসছে, অন্যদিকে নানাভাবে অর্থ পাচারের রিজার্ভ সংকট তৈরি করেছে। এর থেকে উদ্ধারের কথা বলে আইএমএফের  কাছ থেকে বহু রকম শর্ত মেনে ঋণ নেওয়া হয়েছে। আইএমএফ এই ঋণ দেবে তিন বছরে অনেক শর্ত বাস্তবায়ন করার পর। অথচ এই পরিমাণ অর্থ প্রবাসীরা প্রায় প্রতি দুই মাসেই দেশে পাঠাচ্ছেন। বিগত সরকার স্বস্তির জন্য ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে গিয়ে উৎপাদন, পরিবহন ও জীবনযাত্রার ব্যয় সবই বেড়েছে। এই নজিরবিহীন ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও জনগণের কাছ থেকে কর, শুল্ক সারচার্জ বা বর্ধিত দাম আদায়ের ক্ষেত্রে বিগত সরকারের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কর, জিডিপি আরও বাড়াতে জনগণের ওপর করজাল সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। করজাল সম্প্রসারণ করতে গিয়ে যাদের করযোগ্য আয় নেই, তাদের ওপরও ২০০০ টাকা কর আরোপ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ সরকারকে যে কর শুল্ক দেয়, তা গত ১৪ বছরে ৮ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু যাদের হাতে দেশের আয় ও সম্পদের বৃহদাংশ, তারা প্রকৃতপক্ষে কর জালের বাইরে। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের কেবল নিয়ামক শক্তিই নন, বরং ব-দ্বীপের ১৮ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে টেকসই উন্নয়নের এক ‘বদ্বীপ-মডেলের’ জনকও বটে। অর্থাৎ বৈচিত্র্য-বিধ্বংসী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিপরীতে দেশে যে সম্পদ ও প্রকৃতিবান্ধব জ্ঞান প্রয়োগ করে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে এবং মেগা প্রকল্পের ঋণ ও দুর্নীতিমুখী পন্থা পরিহার করে উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ করা যায়, তার প্রমাণ হলো জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি। বর্তমান সরকার ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা প্রদানে ধারাবাহিক সাফল্য প্রদর্শনই হওয়া উচিত এ সরকারের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঠিক ধারা থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জিয়ার ১৯ দফার গুরুত্ব অনুধাবন ও এর আলোকে বিএনপির ৩১ দফার বাস্তবায়নই হতে পারে বিদ্যমান সংকট ও আসন্ন বিপর্যয় থেকে দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করার কার্যকর উপায়। তাই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনে, জিয়ার ১৯ দফা বাস্তবায়নের পাশাপাশি ইতিবাচক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক প্রয়াস অব্যাহত রাখাই গণতান্ত্রিকভাবে নবনির্বাচিত সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। দিশেহারা দেশবাসীর দীর্ঘমেয়াদি মুক্তির জন্য শহীদ জিয়ার ১৯ দফার আলোকে প্রস্তাবিত ৩১ দফা রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তন প্রয়াস রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে সফল হবে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ বিএনপির রাষ্ট্র মেরামত সংক্রান্ত দফাগুলোতে রাষ্ট্রীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ ও তা থেকে উত্তরণের সুস্পষ্ট কর্মপন্থা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে জিয়ার ‘বদ্বীপ মডেল’ অনুসরণ করা হয়েছে।

লেখক: উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত