অল্প আমলেও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬, ০১:৩৯ এএম

মসজিদে হারামের জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. ফয়সাল বিন জামিল গাজ্জাভি মুসলমানদের রমজানের অবশিষ্ট দিনগুলোকে গনিমত মনে করে বেশি বেশি ইবাদতে মনোযোগী হতে এবং অলসতা ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অল্প আমলেও আল্লাহর অনুগ্রহে বেশি সওয়াব পাওয়া যায় এবং আমলের মূল্যায়ন হয় তার শেষ অবস্থার ভিত্তিতে। তাই মানুষকে দ্রুত তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে।

শায়খ বলেন, হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা আপনাদের রবের ডাকে সাড়া দিন এবং এই মাসের বাকি দিনগুলোকে কাজে লাগান। আপনাদের পরিণাম নিয়ে চিন্তা করুন এবং অবহেলার দিনগুলোতে যে শ্রম দিয়েছিলেন, তার বদলে এখন ইবাদতে দ্বিগুণ শ্রম দিন। আপনাদের হাতের নাগালে থাকা ইবাদতের সুযোগগুলো গ্রহণে অলসতা করবেন না, ক্লান্ত হবেন না এবং এই গনিমতগুলো থেকে বিমুখ থাকবেন না, নতুবা আপনারা বঞ্চিত হবেন।

ইবনে রজব (রহ.) বলেন, রমজানে ক্ষমার উপায়-উপকরণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই মাসে ক্ষমা পেল না, সে চরম বঞ্চিত। জেনে রাখুন হে আল্লাহর বান্দারা! সবচেয়ে বড় লাভ ও অর্জন হলো আল্লাহ যদি বান্দার জন্য রহমতের কোনো দরজা খুলে দেন এবং বান্দা সেই সুযোগ গ্রহণ করে রবের সওয়াবের আশায় তাতে অবিচল থাকে।

নবীজি (সা.) তার কিছু সাহাবির জন্য জান্নাত ও উচ্চ মাকামের সাক্ষ্য দিয়েছেন, যদিও তাদের ইসলাম গ্রহণের পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পার হয়েছিল। তারা সেই অল্প সময়েই আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে জিহাদ করে শহীদ হয়েছিলেন। যেমন এক ব্যক্তি লোহার বর্ম পরিহিত অবস্থায় নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি কি যুদ্ধ করব নাকি ইসলাম গ্রহণ করব? তিনি বললেন, আগে ইসলাম গ্রহণ করো, তারপর যুদ্ধ করো। সে ইসলাম গ্রহণ করল, যুদ্ধ করল এবং শহীদ হলো। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, সে কাজ করল অল্প, কিন্তু প্রতিদান পেল অনেক।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও দান হিসেবে অল্প কাজেও অনেক সওয়াব পাওয়া সম্ভব। এই ব্যক্তি ইসলামের মাধ্যমে সফল হয়েছে এবং জান্নাতের নেয়ামত লাভ করেছে। এই হাদিস আরও প্রমাণ করে যে, আমলের মূল্যায়ন হয় শেষ অবস্থার ওপর। তাই যে ব্যক্তি জীবনের শুরুতে মন্দ কাজ করেছে, কিন্তু শেষে তওবা করে সংশোধন হয়েছে এবং পাপ ছেড়ে দিয়েছে, তার পেছনের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।

হে আল্লাহর বান্দারা! আসুন আমাদের রবের দান গ্রহণের জন্য আমল বাড়িয়ে দিই, তার সঠিক দ্বীনের ওপর অবিচল থাকি এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকি। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে এবং মৃত্যু আমাদের আশার শিকল কেটে দিচ্ছে। আমাদের প্রস্তুতি নিতেই হবে, কারণ মৃত্যু অনিবার্য এবং যা হারিয়ে গেছে তা আর ফিরে আসবে না।

মহান আল্লাহ সেই বান্দার ওপর রহম করুন, যে নিজেকে কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছে, মৃত্যুর আগে নিজের নফসকে দেখেছে এবং সামর্থ্য থাকতে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করেছে। হে আল্লাহর বান্দারা! আমরা যেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হই। অতীতে যে অবস্থাই থাকুক না কেন, এখনো সুযোগ আছে। আল্লাহর সঙ্গে যারা সম্পর্ক করে তারা লাভবান হয়। যে আল্লাহর হকের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছে, তার উচিত অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসা।

ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, যে পাপ করে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করল, সে তার পিতা আদমের সদৃশ হলো। আর যে তার পিতার সদৃশ হয় সে জুলুম করে না। যে তার পিতা আদম (আ.)-এর মতো নিজের পাপ স্বীকার করে অনুতপ্ত হয়, আল্লাহ তাকে মনোনীত করেন ও পথ দেখান। আর যে ইবলিসের মতো অহংকার ও অবাধ্যতায় অটল থাকে, সে মহান আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়।

এখন সময় এসেছে রমজানের শেষে দ্রুত তওবা করার, দেরি না করার। যে রমজানে তওবা করল না, সে কবে করবে? যে এই বরকতময় রাতগুলোতে রবের কাছে ফিরল না, সে কবে ফিরবে? তওবাকারীর শ্রেষ্ঠ দিন হলো তার তওবার দিন। রবের কাছে ফিরে আসার আনন্দ কত মহান! আল্লাহ দয়া করে তার গুনাহগুলো মুছে দেন এবং তার সম্পর্কে বলেছেন, আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলোকে নেক কাজ দিয়ে বদলে দেন। ইয়াহইয়া ইবনে মুয়াজ (রহ.) বলেন, তওবাকারীর এমন মর্যাদা যা অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা হয় না, কারণ আল্লাহ তার তওবায় খুশি হন।

হে আল্লাহর বান্দারা! যারা অতীতে উদাসীন ছিলেন এবং নিজেদের ওপর জুলুম করেছেন, তাদের জন্য এটি জরুরি আহ্বান। আমাদের যার যতটুকু সময় বাকি আছে তাতে সংশোধন হওয়া উচিত। আমরা আজ যা আমল করছি তা সংরক্ষিত আছে এবং কাল রবের সামনে তা উপস্থিত হবে। দিনগুলো মানুষের জন্য একেকটি সিন্দুক, যা আমল দিয়ে পূর্ণ হবে। কেয়ামতের দিন এই সিন্দুকগুলো খোলা হবে। মুত্তাকিরা সেখানে সম্মান পাবে আর পাপিষ্ঠরা পাবে আক্ষেপ ও লজ্জা।

রমজান মাস আমাদের পক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষী হবে। এটি ইবাদতকারীদের পক্ষে আর গাফেলদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। তাই আমাদের উচিত, নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করা এবং বাকি দিনগুলোকে কাজে লাগানো। কে জানে, কে আগামী রমজান পর্যন্ত বেঁচে থাকবে? আমাদের মাঝ থেকে অনেকেই চলে গেছেন, যারা এই মাস পূর্ণ করতে পারেননি।

হে আল্লাহর বান্দারা! জেনে রাখুন, সেই ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি সওয়াব ও সৌভাগ্যের অধিকারী, যে রমজান পেল এবং তাকওয়া অর্জন করল, অন্যদের উপকার করল এবং হকের দাওয়াত দিল। রমজান এখন বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এর দিনগুলো শেষ হয়ে আসছে। সেই ব্যক্তি সফল, যে সুন্দরভাবে আমল শেষ করেছে এবং ক্ষমা চেয়েছে। কারণ আমলের মূল্যায়ন হয় তার সমাপ্তির ওপর।

ইবাদত কবুলের একটি লক্ষণ হলো, বান্দা আল্লাহর জন্য ইখলাসের সঙ্গে কাজ করবে এবং কবুল না হওয়ার ভয়ে ভীত থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাদের দানের বস্তু দান করে, আর তাদের অন্তর ভীত শংকিত থাকে এ জন্যে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে।’ (সুরা মুমিনুন ৬০)

পূর্বসূরী আলেমরা আমল নিখুঁত করার চেষ্টা করতেন এবং এরপর তা কবুল হওয়া নিয়ে চিন্তিত থাকতেন। আলী (রা.) বলতেন, আমল করার চেয়ে তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দাও। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদের পক্ষ থেকেই কবুল করেন।’ (সুরা মায়েদা ২৭)

হে আল্লাহর বান্দারা! রমজান যেমন বিদায় নিচ্ছে, আমাদের জীবনও শেষ হয়ে যাবে। আয়ু সীমিত এবং নিঃশ্বাস গোনা। এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন, যে ব্যক্তির একটি দিন তার মাসকে ধ্বংস করে, একটি মাস বছরকে ধ্বংস করে, আর

বছর তার আয়ুকে ধ্বংস করে, সে কীভাবে দুনিয়া নিয়ে আনন্দিত হয়? যার জীবন তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সে কীভাবে খুশি হয়?

হে মুমিনগণ, আমাদের রবের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকারের ওপর অটল থাকতে হবে। ইবাদতে অলসতা করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার রবের ইবাদত করো যতক্ষণ না তোমার কাছে মৃত্যু আসে।’ (সুরা হিজর ৯৯) আমাদের উচিত, বেশি বেশি দোয়া করা, যেন আল্লাহ আমাদের ইমানের ওপর অটল রাখেন এবং শেষ পরিণাম ভালো করেন।

হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলমানদের মর্যাদা দান করুন এবং কাফেরদের লাঞ্ছিত করুন। মুসলিম উম্মাহকে সব ধরনের ফেতনা ও যুদ্ধ থেকে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! ফিলিস্তিনের ভাইদের সাহায্য করুন, তাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করুন এবং তাদের হেফাজত করুন।

১৩ মার্চ শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা।

সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত