ক্ষমতায় আসার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বিএনপি আরেকটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করছে। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আজ সোমবার থেকে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়া এলাকায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। দিনাজপুর ছাড়াও এদিন দেশের ৫৩টি জেলায় একযোগে খাল খননকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকার মৃতপ্রায় ও ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনঃখনন করা হবে। এতে সেচব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে, বর্ষাকালীন জলাবদ্ধতা কমবে। এ ছাড়া মাছ চাষ, হাঁস পালনসহ খালনির্ভর অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। খাল পুনরুদ্ধারের ফলে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, বন্যা-জলাবদ্ধতা হ্রাস পাবে, স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল সোয়া ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। এরপর তিনি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুরে যাবেন। বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ‘সাহাপাড়া খাল’ খননের মাধ্যমে ‘খাল খনন কর্মসূচি ২০২৬’ উদ্বোধন করবেন। দুপুর সাড়ে ১২টায় সেখানে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বিকেল সাড়ে ৩টায় দিনাজপুর পৌরসভার উপশহরে শেখ ফরিদ মডেল কবরস্থানে নানা-নানি ও খালার কবর জিয়ারত করবেন। বিকেল ৫টায় দিনাজপুর সার্কিট হাউজ চত্বরে সুধী সমাবেশ ও ইফতার মাহফিলে যোগ দেবেন।
বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকটের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতো। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে তার উদ্যোগে গৃহীত খাল খনন কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়েছিল, যা ‘সবুজ বিপ্লব’-এর অংশ হিসেবে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে খনন করা অনেক খাল এখন ভরাট হয়ে গেছে, ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এসব সংকট নিরসনে সরকার নতুন করে খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার দুপুরে সাহাপাড়া-বলরামপুর খাল পরিদর্শন করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ খাল খনন হলে সাড়ে ৩ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। অতিরিক্ত বন্যা থেকে সুরক্ষা মিলবে এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা পাওয়া যাবে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বিএডিসির সমন্বয়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে।’
জাহিদ হোসেন জানান, খননের পাশাপাশি খালের পাড় রক্ষা, বাঁধ নির্মাণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও নেওয়া হবে। খালের পানি বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে কৃষি উৎপাদন বাড়ে এবং স্থানীয় অর্থনীতির উন্নতি ঘটে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর দিনাজপুর সফর উপলক্ষে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। দিনাজপুর জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) ইতিমধ্যে এসে পৌঁছেছে। তাদের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা হয়েছে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর তিনটি কর্মসূচি স্থলে এসএসএফের তত্ত্বাবধানে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসএসএফ ছাড়াও সেনাবাহিনী, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তিন হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া সাদা পোশাকে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য, এনএসআই, ডিজিএফআইসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
কৃষক কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন পহেলা বৈশাখে : ফ্যামিলি কার্ডের পর এবার কৃষক কার্ড বিতরণ করবে সরকার। আগামী পহেলা বৈশাখ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। গতকাল রবিবার সকালে বাংলাদেশ সংসদ সচিবালয়ে কৃষক কার্ড বিতরণ কর্মসূচি নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। রুমন জানান, বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ ও প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং স্থানীয় সরকার, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ সংশ্লিষ্টরা।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, কৃষক কার্ড বিতরণের এই উদ্যোগ দেশের প্রান্তিক কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং কৃষি খাতে আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা রাখবে। আগামী বাংলা নববর্ষের দিন প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশের কৃষকদের জন্য নতুন এ সুবিধার সূচনা হতে যাচ্ছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কৃষি প্রণোদনা সরাসরি ও স্বচ্ছভাবে বিতরণ করা হবে। এর প্রধান লক্ষ্য দেশের কৃষকদের কৃষি সরঞ্জাম, ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রাপ্তি সহজ ও আধুনিক করা।
এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ‘কৃষক কার্ড’ চালুসংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, ফ্যামিলি কার্ডের মতো কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’ চালু করছে সরকার। এ নিয়ে দ্রুতই পাইলট প্রকল্প শুরু হতে যাচ্ছে। কৃষক কার্ডের বিষয়টি আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। নীতিগতভাবে বহু আগেই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেছেন।
