ধনীদের আয়ে গরিবরাও বড়লোক!

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৪ এএম

গাজীপুরের টিএনজেড পোশাক কারখানার কর্মী ছিলেন হাকিম ইসলাম। গত বছর কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। নতুন কারখানায় চাকরি নেওয়ার পার ওভারটাইমসহ মাসে ১৬ হাজার টাকা বেতন পান তিনি। অর্থাৎ তার বছরে আয় ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা।

অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের হিসাব মতে, বিএনপির সবচেয়ে ধনী এমপি জাকারিয়া তাহেরের বার্ষিক আয় ৫৯ কোটি ১৬ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭২ টাকা। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশে বর্তমান মাথাপিছু আয় বছরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ। সে হিসেবে ১ হাজার ৭৬৮ জনের মাথাপিছু আয় যত, জাকারিয়া তাহেরের আয় তত।

মাথাপিছু আয়ের সংখ্যাটি জানানোর পর দেশ রূপান্তরকে হাকিম বলেন, ‘দীর্ঘদিন একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতাম। বেতন বাড়েনি। উল্টো গত বছর কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ছয়/সাত মাস বেকার থাকার পর আরেকটি কারখানায় চাকরি নিয়েছি। ওভারটাইমসহ বেতন পাই ১৬ হাজার টাকার কাছাকাছি। কিন্তু বড়লোকদের আয়ে আমরাও কাগজে-কলমে ধনী হয়ে গেছি।’

দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে আয় না বাড়ায় হিমশিম অবস্থা শুধু ঢাকাবাসীর নয়। ঢাকার বাইরে যারা আছেন, তাদেরও একই অবস্থা। চট্টগ্রামের ইয়াসমিন আরা (৪০) পেশায় পোশাকশ্রমিক। ৫ আগস্টের পর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাকরি হারিয়েছেন। চুক্তিভিত্তিক ছোট একটি কারখানায় কাজ করেন। এখন তার আয় কমে অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে।

মোবাইল ফোনে ইয়াসমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে যে কারখানায় কাজ করেছি, বেতন পেতাম ওভারটাইমসহ ১৪ হাজার ৫০০ টাকা। প্রায় চার বছর বেতন বাড়াননি মালিক। ৫ আগস্টের (জুলাই গণঅভ্যুত্থান) পর কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। আয়ও কমে যায়। কিন্তু বাজারের সবকিছুর দাম বাড়তি। ফলে বাধ্য হয়ে খাবারের খরচ কমাতে হয়েছে।’

সদ্য প্রকাশিত বিবিএস ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্তমান মাথাপিছু আয় প্রায় ২ হাজার ৭৬৯ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ১২০ টাকা ৮২ পয়সা ধরে হিসাব করে বিবিএস বলছে, বাংলাদেশি টাকায় মাথাপিছু এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫১১ টাকা। যদিও ডলারের বিদ্যমান হার বিবেচনায় নিলে এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ টাকার কাছাকাছি।

কভিড-১৯ চলাকালে ২০২১-২১ অর্থবছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৯৩ ডলার। এর পরবর্তী দুই অর্থবছরে (২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪) এ হার কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ২ হাজার ৭৪৯ ও ২ হাজার ৭৩৮ ডলারে।

কয়েক বছর ধরে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থান হয়। তারপর শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে খাদ্যপণ্যের দাম কমবে এমন প্রত্যাশা ছিল ভোক্তাদের। কিন্তু চাল, ডাল, ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম আরও বেড়ে গেছে। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সার্বিক প্রভাবও পড়েছে মূল্যস্ফীতিতে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। ওই অর্থবছরের শেষের দিকে মূল্যস্ফীতি ৮-এর ঘরে নামানো গেলেও জুলাই- আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ শতাংশে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ১২ শতাংশে স্থির রয়েছে। ফলে প্রকৃত আয় বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। দেশে মাথাপিছু আয় বাড়ার তথ্যে ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা গেলেও দরিদ্রতার সূচকও কয়েক বছর ধরে ঊর্ধ্বমুখিতায় রয়েছে। বিবিএসের তথ্যমতে, দেশে ২০২৪ সালে ২৬ লাখ ২০ হাজার বেকার জনগোষ্ঠী ছিল, যা ২০২৩ সালে ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার।

এদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। সর্বশেষ প্রকাশিত বিবিএসের তথ্যে জানিয়েছে, জিডিপি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। অর্থবছর জুড়ে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, বিনিয়োগে স্থবিরতা, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির মধ্যে মানুষের মাথাপিছু আয় কীভাবে বাড়ল তা নিয়ে প্রশ্ন রেখেছেন নাগরিকরা।

মাথাপিছু আয় বেড়েছে, সেটা জানেন কি না জিজ্ঞেস করলে ইয়াসমিন বলেন, ‘যারা আয় বাড়ার কথা বলে, তারা একবার বস্তিতে যাক, গ্রামে যাক, তাইলে দেখবে, মানুষ কত কষ্টে দিন পার করছে। আয় বাড়ে বড়লোকদের। আর আমাদের মতো গরিব মানুষদের খেয়ে না খেয়ে দিন পার করতে হয়।’

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রবৃদ্ধির হার যদি জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে মাথাপিছু গড় আয় বাড়বেই। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আয়, ভোগ ও সম্পদবৈষম্য বাড়ছে। মাথাপিছু আয়ের ভেতর অনেক বৈষম্য লুকিয়ে আছে। যাদের সম্পদ বেশি, তাদের সম্পদের রিটার্ন বেশি হয়; আয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি।’

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখে। সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে দরিদ্রতার হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ২১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছার পূর্বাভাস দিয়েছিল।

এ অবস্থায় মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকার আয় বাড়ার যে হিসাব দেয়, তা হলো গড় হিসাব। গড়ের মধ্যে সবসময় বণ্টনের ফাঁকি লুকিয়ে থাকে। বণ্টনের ন্যায্যতা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুন্ন হয়। ফলে কয়েক বছর ধরেই আয়বৈষম্য বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিবিএসের কাছ থেকে নির্মোহভাবে বাস্তব পরিসংখ্যানটাই আশা করি। বর্তমান হিসাবটা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের। ওই সময় সরকারের চাপ ছিল না। আমার তো মনে হয়েছে, বিবিএস প্রকৃত অবস্থাটাই তুলে ধরেছে। সেখানে অতিরঞ্জিত কিছু আছে বলে মনে হয় না। তবে বিবিএসের স্যাম্পল সাইজ ও গণনা পদ্ধতি আরও উন্নত করার সুযোগ আছে বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর।’

এ বিষয়ে ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের পরিচালক মুহাম্মদ আতিকুল কবীরের ভাষ্য, ‘জনসংখ্যার সর্বশেষ এস্টিমেট থেকে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে।’

দেশে একমাত্র প্রতিষ্ঠান বিবিএস মাথাপিছু আয় হিসাব করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলেছেন, এক বছরে দেশজ উৎপাদন থেকে যে আয় হয়, তার সঙ্গে রেমিট্যান্স যোগ করে জাতীয় আয় বের করা হয়। সেই জাতীয় আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে গড় মাথাপিছু বের করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত