বর্তমান সরকার নির্বাচনী ওয়াদার দ্বিতীয় পদক্ষেপ গতকাল সূচনা করল। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর-সাহাপাড়া এলাকার ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল পুনঃখননের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের ৫৩টি জেলায় এই কর্মসূচির চিহ্নিত খাল খননের আয়োজনও ছিল। খাল কেটে শুকনো মৌসুমে পানি ধরে রেখে খাদ্যশস্য উৎপাদনের যে সূচনা করেছিলেন ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়া, সেই উত্তরাধিকার বহন করছেন তারেক রহমান। স্বেচ্ছাশ্রম ও ‘কাবিখা’র ভিত্তিতে সে সময় খাল খনন কর্মসূচি পালিত হতো। বর্তমানে এই পর্যায়ে খাল খনন কোন ভিত্তিতে হচ্ছে, তা অজানা। এগুলো কি সরকারি অর্থে পরিচালিত হবে, না স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে হবে তা পরিষ্কার করা জরুরি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বিএনডিসির সমন্বয়ে এ-কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ডা. জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘প্রায় ১২ কিমি দীর্ঘ এ-খাল খনন হলে, সাড়ে তিন লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। বন্যা থেকে রক্ষা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা পাওয়া যাবে। দেশের বিভিন্ন এলাকার মৃতপ্রায় ও ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো খনন করা হবে। এতে প্রান্তিক কৃষিজীবনে সেচব্যবস্থার উন্নতি হবে। বর্ষাকালীন জলাবদ্ধতা বাড়বে। মাছচাষ, হাঁস পালনসহ খালনির্ভর অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।’
কর্মসূচি গ্রহণ, উদ্বোধনই কেবল নয় এর পেছনে আছে একজন রাষ্ট্রনায়কের স্বপ্ন আর কল্পনার প্রণোদনা। তিনি শহীদ জিয়াউর রহমান। তার সময়ে যেসব খাল খনন হয়েছিল, তার প্রতিফলন পাওয়া গিয়েছিল ধান উৎপাদনে বাম্পার ফলনের মাধ্যমে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেসব খাল ভরাট ও বেদখল হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও খাল দখল করে উঠে গেছে স্থাপনা। খাল দখল করে চাষের জমিও বানিয়েছে বলশালী গ্রামীণ লোকেরা। বেহাত হয়ে যাওয়া খাল উদ্ধার কি সরকার করবে? নাকি বিদ্যমান খালগুলো খনন করবে? খালগুলো মূলত প্রাকৃতিক প্রবাহের শিরা-উপশিরা। বাংলাদেশ খাল-বিল হাওর-বাঁওড় আর নদ-নদীবেষ্টিত বদ্বীপ। নদীবিধৌত বাংলাদেশ পলি আর পলির পল্লবে সিক্ত হয়ে নতুন হয়ে ওঠে বর্ষার পর। কিন্তু আমাদের বুভুক্ষু চেতনা এই যে, মানুষ কেবল ভূমিকেই তার সম্পদ ভাবে। ফলে এক ছটাক জমির জন্য খুনোখুনি করতে পিছপা হয় না। যারা সরকারি খাল দখল করে নির্মাণ করেছেন স্থাপনা, তাদের ‘ভূমিখোর’ বলে চিহ্নিত করলে এই দখলের সমাধান হবে না। সেই খাল ও সরকারি জমি উদ্ধার করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব আছে। তাদের দায়িত্ব সরকারি খালের রক্ষণাবেক্ষণ করা।
কেবল খালই খনন করে সেচ সুবিধা গড়ে দেবে না সরকার, ফলদ বৃক্ষ রোপণ করা হবে দুই পাড়ে এবং সামাজিক বনায়নের মডেলে সেসব গাছ রক্ষা করে তার ফল ভাগাভাগি করে ভোগও করতে পারেন তারা। এই মালিকানাবোধ জাগ্রত করার দায়িত্ব সরকারের হলেও, পরিবেশবিদ ও দেশের শিক্ষিত প্রজন্মকেও এই দায়িত্ব দিতে হবে। তরুণ প্রজন্মই কেবল পারবে, কোনো অসাধ্য কাজকে সাধ্য করতে। প্রত্যেক গ্রামের প্রতিটি খাল যেন খননের আওতায় আসে, সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে। কঠোরভাবে মনিটরিং করা ছাড়া খনন কর্মসূচি ভেস্তে যেতে পারে। কত ফুট গভীর করে খাল খনন হবে, সেটা নিশ্চিত করা সরকারি সংশ্লিষ্টদের তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। এর বিকল্প নেই। খাল খনন কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) দিয়েও সম্পন্ন করা যায়। আবার রাজনৈতিক দলের অনুসারীদেরও খননকাজে লাগালে, রাজনৈতিক প্রণোদনা বাড়বে। মূলত কর্মসূচির লক্ষ্য পূরণ করতে হলে, আত্মউদ্বোধিত জনশক্তিকে কর্মসূচির প্রাণভোমরা হিসেবে গড়তে হবে।