ইউশা মুহাম্মদ শাহরিয়ার প্রতিভাবান হাফেজ, আলেম ও মুফতি। রাজধানীর বনশ্রীর এক মাদ্রাসায় আরবি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন ১ বছর। বর্তমানে কর্মরত ধানমণ্ডির একটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। খতমে তারাবি পড়াচ্ছেন ১ যুগ ধরে। এবার তারাবির ইমামতি করছেন ময়মনসিংহ সদরে। হাফেজ হওয়ার প্রেরণা, খতমে তারাবি পড়ানোর অনুভূতি-অভিজ্ঞতা, তরুণ হাফেজদের জন্য বার্তা এবং সন্তানদের হাফেজ বানাতে ইচ্ছুক অভিভাবকদের নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি আতিকুর রহমান
দেশ রূপান্তর : আপনার হাফেজ হওয়ার প্রেরণা কী ছিল?
ইউশা মুহাম্মদ শাহরিয়ার : আমার হাফেজ হওয়ার প্রেরণা ছিল কিছুটা ভিন্ন। আমার তখন ছয় বছর। বাবা ইন্তেকাল করেন। এরপর প্রায়ই সবার মুখে শুনতাম, বাবার স্বপ্ন ছিল আমি যেন হাফেজ, মাওলানা, মুফতি হই। পড়াশোনার শুরুর দিকে এ কথাগুলোই আমাকে অনুপ্রাণিত করত। এরই মধ্যে ফজরের পর নিয়মিত মক্তবে যাওয়া শুরু করি। সেখানে একটি হাদিস আমাদের শেখানো হতো, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়। (সহিহ বুখারি) এই বিষয়গুলো হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং আমার হাফেজ হওয়ার ইচ্ছা প্রবল হয়ে ওঠে।
দেশ রূপান্তর : প্রথমবার যখন খতমে তারাবিতে ইমামতি করেছিলেন, সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা যদি বলতেন।
ইউশা মুহাম্মদ শাহরিয়ার : তেরো বছর বয়সে প্রথম খতমে তারাবিতে ইমামতি করার সৌভাগ্য হয় আমার। সাধারণ তেলাওয়াতের তুলনায় তারাবিতে কোরআন পড়া অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। একা তেলাওয়াত করলে শুধু শুদ্ধভাবে পড়ার দিকে মনোযোগ দিলেই হয়। কিন্তু তারাবিতে রাকাতের সংখ্যা ঠিক রাখা, নির্ধারিত পৃষ্ঠার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং মুসল্লিদের বড় সমাগমের সামনে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা, সব মিলিয়ে প্রথমবার কিছুটা ভয় ও চাপ অনুভব হয়েছে। তবে আল্লাহর ওপর ভরসায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভয় কেটে যায়। এক-দুই বছরের মধ্যেই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং বিষয়টি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
দেশ রূপান্তর : অনেকে দ্রুত তারাবি শেষ করতে চান, আবার অনেকে ধীরগতির তেলাওয়াত পছন্দ করেন। আপনি কোন পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেন?
ইউশা মুহাম্মদ শাহরিয়ার : তারাবির তেলাওয়াত দ্রুত হবে, নাকি ধীরগতিতে, এ বিষয়টি মূলত মুসল্লিদের অবস্থা ও সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত। যে মসজিদে মুসল্লিরা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে মনোযোগ সহকারে তেলাওয়াত শুনতে সক্ষম, সেখানে ধীর তেলাওয়াতই উত্তম। এতে অন্তরে মানসিক প্রশান্তি তৈরি হয়। আবার যারা আরবি ভাষা বুঝেন তাদের অর্থ বুঝতেও সুবিধা হয়। আর যেখানে অধিকাংশ মুসল্লি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট অনুভব করেন বা বিরক্ত হয়ে হন, সেখানে তুলনামূলক কিছুটা দ্রুত তেলাওয়াত করা যেতে পারে, যেন ইবাদতের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি না হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো তাজবিদ। তেলাওয়াত দ্রুত হোক বা ধীর, শুদ্ধ উচ্চারণ ও তাজবিদের বিধান অক্ষুণœ রাখা অপরিহার্য। তাজবিদ ঠিক রেখেই গতি নির্ধারণ করা উচিত। গতি কখনোই শুদ্ধতার ওপর প্রাধান্য পাবে না।
দেশ রূপান্তর : তারাবিতে তেলাওয়াতের সময় কোনো আয়াতে যখন জাহান্নামের বর্ণনা বা আল্লাহর শাস্তির কথা আসে, তখন আপনার মনের অবস্থা কেমন হয়?
ইউশা মুহাম্মদ শাহরিয়ার : তারাবিতে তেলাওয়াতের সময় কোনো আয়াতে যখন জাহান্নামের বর্ণনা বা আল্লাহর শাস্তির কথা আসে, তখন অন্তর গভীরভাবে কেঁপে ওঠে। আমরা তো তার নাফরমান বান্দা, যখন তিনি আমাদের বিপুল নেয়ামত দেন, আমরা নেয়ামত ভুলে গিয়ে পাপাচারে লিপ্ত হই এবং সেই নেয়ামতের জন্য আমরা যথাযত কৃতজ্ঞতা আদায় করি না। এত সব নেয়ামত ও আনন্দের মাঝে আমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ হয় না।
কোরআন তেলাওয়াতে আখেরাতের কথা বারবার শোনার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর স্মরণ হয়। আর নামাজে তেলাওয়াতের সময় মনে হয়, আমি সরাসরি রবের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তিনি সব দেখছেন এবং একদিন আমাকে তার সামনে উপস্থিত হতে হবে। তখন ভালো ও মন্দ কর্মের হিসাব দিতে হবে। এই উপলব্ধি অন্তরকে নরম করে, অশ্রু ঝরায় এবং মনে হয়, মৃত্যু যেন আমার খুব কাছে।
দেশ রূপান্তর : কোরআনের কোনো বিশেষ আয়াত বা সুরা কি আপনার জীবনে আলাদা প্রভাব ফেলেছে? কখনো কোনো আয়াত পড়ে বা শুনে আনন্দিত হয়েছেন বা কান্না করেছেন?
ইউশা মুহাম্মদ শাহরিয়ার : কোরআনের প্রতিটি আয়াতই আমার হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তবে আমার জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে সুরা যিলযাল। ছোট এই সুরাটির মধ্যেই যেন কোরআনের সারবস্তু সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে কেয়ামত দিবসের ভয়াবহ দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে।
এই সুরার সবচেয়ে গভীর দিক হলো ন্যায়বিচারের ঘোষণা। সামান্য নেক কাজও বিফলে যাবে না, আর সামান্য পাপও উপেক্ষিত হবে না। তাই এ সুরা তেলাওয়াতের সময় একদিকে উত্তম প্রতিদানের আশায় হৃদয় প্রশান্ত হয়, অন্যদিকে মন্দ প্রতিদানের ভয়ে অন্তর ভীত হয়। আশা ও আশঙ্কার এই ভারসাম্যই আমাকে বারবার মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং নেক আমলের প্রেরণা জোগায়।
দেশ রূপান্তর : আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তির ভিড়ে মনোযোগ ধরে রেখে কোরআন হিফজ করা কতটা চ্যালেঞ্জিং বলে আপনি মনে করেন?
ইউশা মুহাম্মদ শাহরিয়ার : আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তির ভিড়ে মনোযোগ ধরে রেখে কোরআন হিফজ করা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কোরআন মুখস্থ করার সর্বপ্রথম শর্ত হলো পূর্ণ মনোযোগ। কিন্তু কার্টুন, ভিডিও গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত আসক্তি শিশুর মনোযোগকে বিভ্রান্ত করে দেয়। ফলে হিফজে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং মুখস্থ অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ছোট বয়স থেকেই শিশুদের শারীরিক খেলাধুলা ও উপকারী কাজে আগ্রহী করে তোলা প্রয়োজন, যেন তারা ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে পারে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। সঠিক দিকনির্দেশনা ও অনুকূল পরিবেশই পারে হিফজের পথ সহজ ও সফল করতে।
দেশ রূপান্তর : আমাদের সমাজে অনেক অভিভাবক সন্তানকে হাফেজ বানাতে চান। তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?
ইউশা মুহাম্মদ শাহরিয়ার : যারা তাদের সন্তানকে হাফেজ বানানোর স্বপ্ন দেখেন, তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো, হাফেজ হওয়ার স্বপ্নটি শুধু অভিভাবকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সন্তানের মনেও সেই স্বপ্ন জাগিয়ে তুলতে হবে। অনেক অভিভাবক নিজেদের স্বপ্ন সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিতে চান। ধরে নিই, সন্তান হাফেজ হয়ে গেল, কিন্তু হাফেজ হওয়ার পরই কোরআনের প্রকৃত হক আদায় শুরু হয়, অর্থাৎ তা নিয়মিত মনে রাখা ও তেলাওয়াত করা। যদি সন্তান কেবল পিতা-মাতাকে খুশি করার জন্য হিফজ করে, তবে হয়তো সে হাফেজ হতে পারবে, কিন্তু পরে কোরআন ঠিকভাবে মনে রাখতে পারবে না এবং ধীরে ধীরে ভুলে যেতে থাকবে। আর কোরআন মুখস্থ করে ভুলে যাওয়ার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর ধমকি রয়েছে।
এ ছাড়া উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করাও অভিভাবকের একটি বড় দায়িত্ব। তাই সন্তানকে কোনো প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর আগে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সামান্য ভুলও সন্তানের ভবিষ্যতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দেশ রূপান্তর : বর্তমান সময়ের তরুণ হাফেজদের জন্য আপনার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি?
ইউশা মুহাম্মদ শাহরিয়ার : কোরআন মূলত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শের প্রতিচ্ছবি। তাই কোরআনকে কেবল মুখস্থ করাই যথেষ্ট নয়, একে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে। কোরআন চর্চার উদ্দেশ্য হলো, কোরআন অনুযায়ী নিজের চরিত্র ও জীবন সংশোধন এবং কোরআনের বিধিবিধান সমাজে বাস্তবায়ন করা, মানুষের সামনে প্রদর্শন উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান সমাজে দেখা যায়, কিছু হাফেজ প্রসিদ্ধি ও মানুষের প্রশংসার পেছনে পড়ে যান। এতে হিফজের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। তাই হাফেজ হওয়ার লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং তার দেখানো পথে জীবন পরিচালনা করা।
দেশ রূপান্তর : ২৭ রমজান আপনার কী কী অনুভূতি হয়?
ইউশা মুহাম্মদ শাহরিয়ার : ২৭ রমজান হাফেজদের জন্য এক ভিন্ন রকম অনুভূতির দিন। এই আনন্দ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দীর্ঘ সময় ধরে তারাবিতে কোরআন তেলাওয়াতের পর এ সময়টায় তারা কিছুটা ফুরসত পান। কারণ পুরো রমজানে তারাবি পড়ানোর দায়িত্ব থাকায় অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়ার তেমন সুযোগ থাকে না। তাই ব্যক্তিগত কাজও অনেক বাকি থাকে। এ সময় ঈদও প্রায় দোরগোড়ায় এসে যায়। ঈদের আনন্দ, প্রস্তুতি ও উৎসবের ভাবনা মিলিয়ে মনে এক বিশেষ আনন্দের সঞ্চার হয়। তবে একই সঙ্গে অন্তরে এক ধরনের আফসোসও জাগে, কারণ এখন আর প্রতিদিন নামাজে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ তেলাওয়াতের সেই সুযোগ থাকবে না। নামাজে কোরআন তেলাওয়াতে গভীর প্রশান্তি রয়েছে।