ইরান যুদ্ধের কারণে মার্চের শেষ দিকে নির্ধারিত চীন সফর প্রায় এক মাস পিছিয়ে দিতে চান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিবিসি জানিয়েছে, গত সোমবার হোয়াইট হাউজে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, চলমান যুদ্ধ তদারকির জন্য ওয়াশিংটনে থাকা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিলের মধ্যে চীনে হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে গত রবিবার ট্রাম্প ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছিলেন, চীন হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে সহায়তা না করলে তিনি বৈঠক স্থগিত করতে পারেন। ট্রাম্প বলেন, এখানে কোনো কৌশল নেই। আমরা একটি যুদ্ধে আছি। আমার এখানে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চীনের সঙ্গে কথা বলছি। আমি যেতে খুবই আগ্রহী, কিন্তু যুদ্ধের কারণে আমি এখানে থাকতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অনুরোধ করেছি, এটি যেন এক মাস বা তার কিছু বেশি সময় পিছিয়ে দেওয়া হয় এবং আমি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছি।’
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও জানিয়েছেন, সফর পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধের সম্পর্ক নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী সচল করতে চীনকে চাপ দিতে এ বিলম্ব করা হচ্ছে না। বেসেন্ট আরও বলেন, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সফরটি হবে কি না, তা আমরা দেখব। তবে আমি একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই এই বিলম্ব কোনোভাবেই হরমুজ প্রণালীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও জোর দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী সচল করতে বেইজিংকে চাপ দেওয়ার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য চীন সফরের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা বলেছেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত সোমবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানিয়েছেন, সফরের সময়সূচি নিয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, সফর পিছিয়ে যাওয়ার সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর কোনো সম্পর্ক নেই এবং এ নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন ‘সম্পূর্ণ ভুল’। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কও নতুন করে উত্তেজনার মুখে পড়েছে। ইরানি জ্বালানির বড় ক্রেতা চীন এবং দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় প্যারিসে দুই দেশের প্রতিনিধির মধ্যে বাণিজ্য, শুল্ক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী উভয় পক্ষ কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালেও, আলোচনা এখনো চলছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের তৃতীয় সপ্তাহে এসে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় মাথাবাথ্যার কারণ হয়ে ওঠেছে ‘হরমুজ প্রণালী’। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগ্রাসনের জেরে তেহরানের বন্ধ করে দেওয়া হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে মিত্রদেশগুলোর পাশাপাশি চীনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্প যে আশায় চীনের সহায়তা চেয়েছিলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। ট্রাম্পের এই চাপ বরং দুই পরাশক্তির মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও উসকে দিতে পারে। গত শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনসহ মিত্রদেশ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে এই নৌপথ সুরক্ষিত করতে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য ট্রাম্পের প্রস্তাবে ‘না’ বলেছে। এমনকি ট্রাম্পের হুমকি সত্ত্বেও ন্যাটোভুক্ত দুই দেশ জার্মানি-গ্রিস ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। অস্ট্রেলিয়াও ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। চীন অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানের জবাবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া এবং উপসাগরীয় জ্বালানিকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানোর ফলে তেলের মূল্য ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরান তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বন্ধ ঘোষণা করায় বিশ্ব জুড়ে তেল ও গ্যাসের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। ফলে আসন্ন জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে।
