বিসিবি-সরকার মুখোমুখি

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ০১:৩০ এএম

পরিচালনা পর্ষদের সবশেষ নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং ২০২৬ সালের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়া; বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের দুটি কার্যক্রমকে তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। এরই মধ্যে বিসিবি নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে সভাপতি করে ৫ সদস্যের স্বাধীন তদন্ত কমিটি এরই মধ্যে গঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, সদ্য সমাপ্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসরে অংশ নিতে না পারার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। বিসিবি এরই মধ্যে নির্বাচনের অনিয়ম অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটির গঠনে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার ব্যপারে তদন্ত বিসিবি এবং সরকারের সম্পর্কে আরও টানাপড়েন সৃষ্টি করবে বলেই সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

মঙ্গলবার একটি ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ কেন বিশ্বকাপে খেলেনি তা নিয়ে ঈদের পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, ‘বিশ্বকাপ ক্রিকেটে কেন আমরা খেলতে যেতে পারিনি বা কেন আমাদের ক্রীড়া কূটনীতির অভাব কোথায় ছিল আমাদের এই বিষয়গুলো অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত এবং এটি নিয়ে আমি হয়তো বা ঈদের পরে আমি একটি তদন্ত কমিটি করে দেব। সেই তদন্ত কমিটির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেব এবং আমাদের কাছে মনে হয় যে ক্রীড়া কূটনীতিতে আমাদের আরও বেশি জোর দেওয়া উচিত কারণ খেলাধুলা এমন একটি জায়গা সেখানে দল মত নির্বিশেষে কিংবা সব রাজনৈতিক চিন্তার ওপরে গিয়ে কিন্তু আমরা একটি জাতিকে এক করে ফেলতে পারি। তো আমরা এমন ভুল ভবিষ্যতে যাতে না করি যাতে আমাদের এই ক্রীড়া কূটনীতির মাধ্যমে যাতে আমরা একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে যাতে খেলাধুলার যেই পরিবেশ সেটিকে আমরা সুন্দরভাবে বজায় রাখতে পারি।’

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছিলেন যে বাংলাদেশ দলের বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়াটা ছিল সরকারি সিদ্ধান্ত। এখন সরকারের দায়িত্বশীল অংশই এই সিদ্ধান্তের পেছনে কার কি ভূমিকা ছিল সেটা তদন্ত করতে চাচ্ছে। ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক বিসিবি পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর মনে করেন, এ বিষয়ে তদন্ত হওয়াটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ, ‘কার আদেশে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি, সেই সিদ্ধান্তটা কে দিয়েছে তদন্ত করে সেটা বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কোনো দেশের প্ররোচনায় বাংলাদেশ এমন সিদ্ধান্ত নিল কি না, কেউ বাংলাদেশের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেল কি না সেইসব তদন্ত করে বের করতে হবে। এই আদেশ যে দিয়েছে, সেটা যদি সেই সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছ থেকেও আসে, তাহলে তাকেও জিজ্ঞাসা করতে হবে এবং তার সেই এখতিয়ার আছে কি না সেটাও দেখতে হবে।’

বিসিবি পরিচালনা পরিষদের  নির্বাচনে ব্যপক অনিয়ম, কারসাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের স্বাধীন তদন্তের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিল আলমগীর। পরে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে ক্যাটাগরি-২ এর প্রায় ১ ডজন ক্লাব কাউন্সিলরের সঙ্গে ক্যাটাগরি-৩ এ মনোনয়ন সংগ্রহ করা আলমগীরও সরে দাঁড়িয়েছিলেন। বিসিবি নির্বাচনে অনিয়ম খুঁজে বের করার তদন্তকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘তদন্ত হলে সবাই মুখ খুলবে, সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে। জেলা প্রশাসকরা বলবেন যে কীভাবে তাদের কাছ থেকে জোর করে মনোনয়ন নেওয়া হয়েছে, বোর্ডের ভেতরের মানুষরাই মুখ খুলবে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যাবে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়ে অনেকেই ভোটকেন্দ্রে এসে ঘোরাঘুরি করেছেন। এসব অনিয়ম তদন্ত করলেই বের হয়ে আসবে।’

১১ মার্চ প্রজ্ঞাপন জারি করে এনএসসি, তাতে একেএম আসাদুজ্জামানকে প্রধান করে ৫ সদস্যের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ১৬ মার্চ একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি জানায়,  ‘উপরে উল্লিখিত গেজেটটি প্রকাশের ফলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, কারণ এটি বিসিবির নির্বাচিত প্রশাসনের স্থিতিশীলতা, স্বাধীনতা এবং ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বৈশ্বিক শাসন কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয় এবং এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের একটি পূর্ণ সদস্য। আইসিসি-র গভর্ন্যান্স ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, কোনো নির্বাচিত ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হতে পারে এমন যে কোনো পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। এটি আইসিসির শাসন ও পরিপালন বিধির আওতায় পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে।’ আলমগীর দেশ রূপান্তরকে জানান, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন অনুযায়ী দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সংস্থা হিসেবে এনএসসির এই এখতিয়ার আছে, ‘বিসিবি’র গঠনতন্ত্রের অনুমোদন দেয় এনএসসি, বিসিবি যে মাঠ ব্যবহার করে সেই মাঠের মালিক হচ্ছে এনএসসি, বিদেশ সফরের জন্য যে গভর্নমেন্ট অর্ডার লাগে সেই জিও ইস্যু করে এনএসসি। বিসিবির পরিচালকদের মধ্যেও দুইজন এনএসসি’র। তাহলে এনএসসি বাইরের হয় কি ভাবে আর সেই এনএসসি’র তদন্ত করার অধিকার নিয়ে বিসিবি কীভাবে প্রশ্ন তুলতে পারে?’

বিশ্বকাপ এবং নির্বাচন এই দুটি স্পর্শকাতর প্রসঙ্গে সরকারের সঙ্গে বিসিবির মুখোমুখি অবস্থান এখন স্পষ্ট। গঠিত কমিটিতে আছেন ডিএমপি’র একজন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি অ্যাডমিন ও দক্ষিণ) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম। মজার বিষয় বিসিবি নির্বাচনে একজন নির্বাচন কমিশনার ছিলেন সদ্য বিদায়ী সিআইডি প্রধান এবং পুলিশের অ্যাডিশনাল ইন্সপেক্টর জেনারেল মো. ছিবগাত উল্লাহ। তিনি পুলিশ ক্রিকেট ক্লাবের ভোটারও ছিলেন সেই নির্বাচনে। তদন্তের স্বার্থে নাসিরুল কি জিজ্ঞাসাবাদ করবেন তার ঊর্ধ্বতনকে?

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত