সাম্য মৈত্রী নির্মল আনন্দের ঈদ

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৯ এএম

উৎসবে অংশগ্রহণ করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। ইসলাম এই প্রবৃত্তিকে দিয়েছে মার্জিত ও আধ্যাত্মিক রূপ। জাহেলি যুগের অর্থহীন আমোদ-প্রমোদের পরিবর্তে, মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে উপহার দিয়েছেন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো বরকতময় দুটি দিন। ঈদের এই আনন্দ কেবল কেনাকাটা বা আড়ম্বরপূর্ণ উদযাপনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মূলে রয়েছে এক মাস সিয়াম সাধনার পর মহান রবের পক্ষ থেকে পাওয়া পবিত্র পুরস্কার। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে ঈদের দিন ছিল সাম্য, মৈত্রী এবং নির্মল আনন্দের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তিনি যেমন ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন, তেমনি শিশু-কিশোর ও পরিবারের সদস্যের বৈধ বিনোদনের প্রতিও ছিলেন সমান যত্নশীল। নবীজি (সা.)-এর সেই আদর্শ আমাদের শেখায়, কীভাবে সীমার মধ্যে থেকে আনন্দকে সর্বজনীন করা যায়। আজকের প্রেক্ষাপটে ঈদের প্রকৃত সার্থকতা অনুধাবনে রাসুল (সা.)-এর সেই আনন্দঘন দিনগুলোর বর্ণনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর ঈদের প্রবর্তন হয়। তিনি মদিনায় পৌঁছে দেখেন, মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিরা শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ উৎসব’ এবং বসন্ত পূর্ণিমায় ‘মেহেরজান উৎসব’ উদযাপন করে। তারা এ উৎসবে নানা আয়োজন, আচার-অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আনন্দ উৎসব করে। তিনি মুসলমানদের এ দুটি উৎসব পালন করতে নিষেধ করে বলেন, মহান আল্লাহ তোমাদের ওই উৎসবের বদলে ‘ঈদুল ফিতর’ ও‘ঈদুল আজহ’র মতো পবিত্র দুটি দিন দান করেছেন। এতে তোমরা পবিত্রতার সঙ্গে উৎসব পালন করো। (সুনানে নাসায়ি) বর্তমানে ঈদ আনন্দের প্রায় পুরোটাই কেনাকাটার মধ্যে নিহিত। প্রথম যুগে বর্তমানের মতো কেনাকাটার বাহুল্য ছিল না। শুধু নিখাদ আনন্দ ছিল। নবীজি (সা.) ঈদের দিন ছোট-বড় সবার আনন্দের প্রতি খেয়াল করতেন। মদিনার ছোট ছোট শিশু-কিশোরের সঙ্গে তিনি আনন্দ করতেন। শরিয়তে অন্তর্ভুক্ত সব আনন্দ করার অনুমতি দিতেন।

দুই ঈদের মধ্যে ঈদুল ফিতর সবচেয়ে বেশি উৎসবমুখর হয়। এর কারণ হলো, পুরো এক মাস রোজা রাখা ও তারাবি পড়ার পর, ঈদের দিন মহান আল্লাহ রোজাদারদের মেহনতের সওয়াব ও পুরস্কার দান করেন। জাহান্নামিদের তালিকা থেকে তাদের নাম মুছে দেন। তাই রোজাদাররা খুশি হয়ে শুকরিয়া-স্বরূপ দান-সদকা করে এবং ঈদের নামাজ আদায় করে। এই নামাজকে নবীজি (সা.) এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, ইসলামের শুরুর যুগে নারী ও শিশুদের ঈদগাহে নিয়ে যাওয়া হতো, এমনকি ঋতুমতী নারীও ঈদগাহে উপস্থিত হয়ে এক পাশে অবস্থান করত। অবশ্য এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। তখন বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা ছিল না। আর তখন ঈদগাহে নারীদের যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, অন্যদের কাছে মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যের বিষয়টি উপস্থাপন করা। পরবর্তী সময়ে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তাদের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। ইমাম তহাবি (রহ.) এমন অভিমত পোষণ করেছেন।

নবীজি (সা.) সব সাহাবিকে ঈদের দিন আনন্দিত হতে উৎসাহিত করেছেন। ছোটদের আনন্দের প্রতি তিনি বিশেষভাবে লক্ষ রাখতেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘একবার ঈদের দিন নবীজি (সা.) রাস্তার পাশে একটি ছেলেকে কাঁদতে দেখে তার কাছে যান। ছেলেটি বলল, তার মা-বাবা কেউই নেই। নবীজি ছেলেটিকে নিজের ঘরে এনে বললেন, আমি তোমার পিতা, আর আয়েশা তোমার মা, ফাতেমা তোমার বোন, আর হাসান হুসাইন তোমার খেলার সাথী।’ ঈদেন দিন নবীজি (সা.)-এর গৃহের  ভেতর-বাহিরে ঈদ আনন্দের নানা চিত্র ফুটে উঠত। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘নবীজি (সা.) ঈদের দিন আমার ঘরে আগমন করলেন। তখন আমার কাছে দুজন বালিকা বুআস যুদ্ধের বীরদের স্মরণে গান করছিল। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। এরই মধ্যে আবু বকর (রা.) ঘরে ঢুকে আমাকে এই বলে ধমকাতে লাগলেন, ‘নবীজির ঘরে শয়তানের বাঁশি বাজানো হচ্ছে?’ নবীজি (সা.) তার এই কথা শুনে বললেন, ‘হে আবু বকর! মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও। প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর আজ আমাদের ঈদের দিন।’ (সহিহ বুখারি)

একদা নবীজি (সা.)-এর গৃহের কাছে এক আনন্দঘন ঈদ উদযাপন হচ্ছিল। এতে অংশগ্রহণ করেছিল শিশুরা, যারা নবীজি (সা.)-এর প্রশংসা করে সুন্দর ও চমৎকার সুরে গান গাইছিল। আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) বসা ছিলেন। তখন আমরা শোরগোল ও শিশুদের হৈচৈ শুনতে পেলাম। নবীজি (সা.) উঠে গিয়ে দেখলেন, এক হাবশি নারী নেচে গেয়ে খেলা দেখাচ্ছে, আর শিশুরা তার চারদিকে ভিড় জমিয়েছে। নবীজি (সা.) বললেন, ‘হে আয়েশা! এসো এবং দেখো। অতএব আমি গেলাম এবং নবীজি (সা.)-এর কাঁধের ওপর আমার চিবুক রেখে তার খেলা প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম। আমার চিবুক ছিল তার মাথা ও কাঁধের মধ্যবর্তী জায়গায়। (কিছুক্ষণ পর) আমাকে তিনি বললেন, (খেলা দেখে) তুমি কি তৃপ্ত হওনি? তোমার কি তৃপ্তি পূর্ণ হয়নি? আমি না না বলতে থাকলাম। আমার লক্ষ্য ছিল, আমাকে নবীজি (সা.) কতটুকু খাতির করেন, তা পর্যবেক্ষণ করা। এমন অবস্থায় সেখানে হজরত ওমর (রা.) আবির্ভূত হন এবং মুহূর্তের মধ্যে সব লোক সেখান থেকে সরে পড়ে। তখন নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি দেখলাম জিন ও মানববেশধারী শয়তানগুলো ওমরকে দেখেই সরে যাচ্ছে।’ আয়েশা (রা.) বলেন, তারপর আমি ফিরে এলাম। (তিরমিজি) এই বর্ণনাগুলো আমাদের দেখিয়ে দেয়, কীভাবে ঈদের দিনে নবীজি (সা.) আনন্দ প্রকাশের অনুমোদন দিয়েছিলেন।

ইসলাম সুস্থ ও সীমার মধ্যে থেকে আনন্দ উদযাপনকে সমর্থন করে। নবীজি (সা.)-এর জীবন থেকে আমরা এমন সুন্দর দৃষ্টান্ত পাই। ইসলামিক স্কলাররা উপরোক্ত হাদিস ও ঘটনাবলি থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করেছেন। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঈদের দিন পরিবার ও সন্তানদের জন্য আনন্দ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা ইসলামসম্মত। তাই ঈদের দিন পরিবার ও সন্তানদের জন্য বৈধ আনন্দ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা উচিত।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত