মাত্র কয়েক দিন আগেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির যেকোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন থেকে ফ্লোরিডার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে হোয়াইট হাউজের সাউথ লনে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘যখন আক্ষরিক অর্থে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন যুদ্ধবিরতির প্রশ্নই ওঠে না।’ কিন্তু মাত্র তিন দিন পরই ট্রাম্পের সুর পুরোপুরি পাল্টে গেছে।
গত সোমবার টেনেসির মেমফিসে এলভিস প্রিসলির বাড়ি গ্রেসল্যান্ড পরিদর্শনের আগে এক জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, ‘তারা মিটমাট করতে চায় এবং আমরাও কাজটা সেরে ফেলতে যাচ্ছি।’
অথচ গত শনিবার সন্ধ্যায়ই ট্রাম্প ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন হরমুজ প্রণালি না খুললে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হবে। এরপরই এই হঠাৎ ‘ভোলবদল’ প্রশাসনের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বৈঠকের আয়োজন হতে পারে, যেখানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উপস্থিত থাকতে পারেন। সিএনএন এ বিষয়ে ভ্যান্সের দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোর সতর্কবার্তার পরই যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তারা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, ইরানের বেসামরিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালালে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার খোলার ঠিক দুই ঘণ্টা আগে এই আলোচনার ঘোষণা আসে। ফলে ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারের দাম বেড়ে যায় এবং ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম দ্রুত কমে। এ দুটি বিষয় ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টাদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তবে ঠিক কার সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে বা আদৌ আলোচনা চলছে কি না তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প ইরানি কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছেন। শুধু বলেছেন, তিনি ‘সম্মানিত’ ব্যক্তি।
সিএনএন বলছে, একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অতিরিক্ত মেরিন সেনা পাঠানো হচ্ছিল, যা আলোচনার বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছে। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্স-এ লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।’ তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা স্থগিত করার আসল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘চোরাবালিতে’ আটকে পড়েছে। তবে ইরান সতর্কতার সঙ্গে এটাও অস্বীকার করেনি যে, দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা চালাচালি চলছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, ওমানসহ একাধিক দেশ এখন সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতা করছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনার খবর সূত্রগুলোর জানা নেই।
হোয়াইট হাউজও বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকার করেছে। তবে ট্রাম্প বলেছেন, তার দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার এই আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, ‘এগুলো সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনা। পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। হোয়াইট হাউজ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত কোনো জল্পনা চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।’
একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানকে ১৫ দফা প্রত্যাশার তালিকা পাঠিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি শর্ত ইরানের পক্ষে ‘প্রায় অসম্ভব’ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্প সোমবার দাবি করেন, দুই দেশ ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে’ পৌঁছেছে।
পাকিস্তানের গোয়েন্দা প্রধান লে. জেনারেল আসিম মালিক বর্তমানে উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র তাহির হুসেন আন্দ্রাবি সিএনএনকে বলেছেন, ‘উভয় পক্ষ রাজি থাকলে পাকিস্তান সবসময় আলোচনার আয়োজন করতে প্রস্তুত।’
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইরান ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন এবং রবিবার উইটকফের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। ওমান হরমুজ প্রণালি নিয়ে বার্তা আদান-প্রদান করছে।
গত সোমবার ট্রাম্প ১৫ দফার কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করে বলেন, ‘তাদের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না এটাই প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্ত।’ তিনি বলেন, ‘ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্র চায় এবং আমরা সেই পারমাণবিক ধুলো চাই।’
অন্যান্য শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা সীমিত করা, ছায়াগোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার করা।
কয়েক সপ্তাহ আগেও ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমাদের জানামতে তাদের সব নেতা মারা গেছে। আমরা জানি না কার সঙ্গে ডিল করছি। কিন্তু এখন তিনি আশাবাদী যে, ইরান সত্যিই কাজ করতে চায়।’
যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়ানোর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর সতর্কবার্তা এবং বাজারের চাপের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন এখন দ্রুত শান্তি আলোচনার পথে হাঁটছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে ইরানের পক্ষে কে সই করবেন, তা এখনো অস্পষ্ট। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল।
হোয়াইট হাউজ বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কোনো জল্পনাকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া উচিত হবে না।
