রাজধানীবাসীর রসনা বিলাসে বছরখানেক ধরে পরিচিত নাম পেশোয়ারাইন আর লাহোর। নেহারি আর কাবাবের জন্য পাকিস্তানের দুই শহরের নামের এই দুই রেস্তোরাঁয় ভিড় জমে খাদ্যপ্রেমীদের। এবার ক্রিকেটপ্রেমীদেরও চোখ থাকবে পেশোয়ার আর লাহোরে, কারণ পাকিস্তান সুপার লিগে এই দুই শহরের দলেই তো আছেন বাংলাদেশের ৫ ক্রিকেটার! পেশোয়ার জালমির হয়ে খেলবেন দুই পেসার শরিফুল ইসলাম ও নাহিদ রানা, সঙ্গে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান তানজিদ হাসান তামিম। লাহোর কালান্দার্স দলে খেলবেন বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান ও উইকেট-রক্ষক ব্যাটসম্যান পারভেজ হোসেন ইমন। বিগব্যাশ খেলা লেগস্পিনার রিশাদ হোসেনের দল রাওয়ালপিন্ডি পিন্ডিজ, যে দলটা আগের মালিকানায় পরিচিত ছিল ‘মুলতান সুলতানস’ নামে। আজ হায়দ্রাবাদ কিংসমেন আর লাহোর কালান্দার্সের ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে পিএসএল-এর ১১তম আসর। গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে লাহোর ও করাচিতে দর্শকবিহীন মাঠেই হবে পিএসএলের সবগুলো ম্যাচ, বাতিল করা হয়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও।
কাছাকাছি সময়ে (২৮ মার্চ) শুরু হচ্ছে ভারতের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ও পিএসএল। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি। গত কয়েক মৌসুমে বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার করেছে টি-স্পোর্টস, সরকারের নির্দেশনা মেনে দেশের একমাত্র স্পোর্টস চ্যানেল এবার সম্প্রচার করছে না টি-টোয়েন্টির সবচেয়ে দামি আসরটি। বরং একই সময়ে অনুষ্ঠিত পিএসএস সম্প্রচার করবে টি-স্পোর্টস। আইপিএলের সময়ে যেহেতু বিশ্বের অন্য দেশগুলোও কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজের সূচি রাখে না, আর বাংলাদেশের ৬ জন ক্রিকেটার খেলবেন পিএসএলে তাই বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখও থাকবে পাকিস্তানের এই টি-টোয়েন্টি আসরেই। সেই সঙ্গে আসন্ন নিউজিল্যান্ড সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে চোখ থাকবে নতুন নিয়োগ পাওয়া নির্বাচকদেরও।
অর্থে ও গ্ল্যামারে আইপিএল এবং পিএসএলের তুলনাটা হবে বিরাট কোহলির সঙ্গে বাবর আজমের তুলনা করার মতোই। সম্প্রতি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি বেঙ্গালুরু রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ও রাজস্থান রয়্যালস বিক্রি হয়েছে যথাক্রমে ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার ও ১.৬৩ বিলিয়ন ডলারে! একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়, আইপিএলের মোট ব্র্যান্ডভ্যালু প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার, যা পাকিস্তানের গোটা দেশের গত এক অর্থবছরের বাজেটের এক-তৃতীয়াংশের সমান। আইপিএল নিলামে উপেক্ষিত থাকার পর পিএসএলে নাম লিখিয়েছিলেন এমন ৪ জন ক্রিকেটার আইপিএল থেকে পরবর্তী সময়ে ডাক পেয়ে পিএসএল ছেড়ে সেখানে যোগ দিয়েছেন। অর্থের ঝনঝনানি আইপিএলে বেশি, তবে পাকিস্তানের সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটারদের দাবি, মাঠের খেলার মানে পিএসএল এগিয়ে। কারণ ফাস্ট বোলিং। পাকিস্তানের বোলিং কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরাম একটা সময়ে আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্স দলের বোলিং কোচ ছিলেন। এবারের মৌসুমে সেই দলে তারকা ব্যাটসম্যানদের ভিড়ে পেস বোলিংয়ের নেতৃত্বে জিম্বাবুয়ের ব্লেসিং মুজারাবানিকে দেখেই হয়তো তার মনে হয়েছে, ‘আইপিএলে আপনি সাধারণত প্রতি দলেই এমন একজন বোলার পাবেন যাকে আক্রমণ করা যায়। কিন্তু পিএসএলে বোলিংয়ের মান অনেক উন্নত... বিদেশি খেলোয়াড়রা সবসময় আমাকে বলে যে এখানকার বোলিংয়ের মান সত্যিই দারুণ।’ মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়া, হর্শিত রানার চোটের কারণে সরে দাঁড়ানোর ফলে পিএসএল থেকে দল বদলে আইপিএলে যোগ দেওয়া মুজারাবানিই এখন কেকেআর-এর প্রধান পেস বোলার। অন্যদিকে পিএসএল-এর দলগুলোতে পেসারদেরই দাপট। লাহোরে মোস্তাফিজুর রহমানের সতীর্থ শাহিন শাহ আফ্রিদি, হারিস রউফ। ইসলামাবাদে শামার জোসেফ ও মোহাম্মদ হাসনাইন, পেশোয়ারে নাহিদ রানা ও শাহনেওয়াজ দাহানি।
তবে এইবার যেহেতু শেষ মুহূর্তে খেলা মাত্র দুটো ভেন্যুতেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, ফলে ব্যবহৃত উইকেটেই বেশি বেশি ম্যাচ হবে। অর্থাৎ টুর্নামেন্টের পরের দিকে স্পিনারদের কার্যকারিতা বাড়বে। যে কারণে রিশাদ হোসেন, অ্যাডাম জাম্পা কিংবা সুফিয়ান মুকিমদের মতো রিস্ট স্পিনারদের কার্যকারিতা বাড়তে পারে টুর্নামেন্টের শেষ দিকে।
ভালো উইকেটে ভালো বোলিংয়ের বিপক্ষে খেললেই বাড়ে ব্যাটসম্যানের ধার। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বড় অভিযোগ, দেশে ভালো মানের উইকেট নেই। উইকেটে অসমান বাউন্স, মন্থর গতি আর নিচু হয়ে আসা বলে শট খেলার আত্মবিশ্বাসটা তৈরি হয় না। দেশের বাইরে তাই নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ তানজিদ হাসান তামিম ও পারভেজ হোসেন ইমনের। বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দলের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান খেলবেন যথাক্রমে পেশোয়ার জালমি ও লাহোর কালান্দার্স দলের হয়ে। জালমিতে বাবর আজম, জেমস ভিনস, কুশল মেন্ডিসদের মধ্যে একাদশে জায়গা ধরে রাখার জন্য পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের ফর্মটা ধরে রাখতে হবে তানজিদ তামিমকে। লাহোর কালান্দার্স ৪ বিদেশির ভেতর সিকান্দার রাজা, দাসুন শানাকা আর মোস্তাফিজকে নিঃসন্দেহে একাদশে রাখবে, সেক্ষেত্রে চতুর্থ বিদেশির জায়গাতে পারভেজ ইমন ঢুকবেন নাকি অন্য কেউ সেটা ব্যাটিং আর উইকেটকিপিং দিয়ে ইমনকেই ঠিক করতে হবে।
এবারের পিএসএল আসরে খেলছেন বাংলাদেশের ৬ ক্রিকেটার, এর আগে দেশের বাইরে কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে এত বেশি বাংলাদেশের ক্রিকেটার একসঙ্গে সুযোগ পাননি। বোলার বা অলরাউন্ডারদের সুযোগ মিললেও টপ অর্ডারে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সুযোগ ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খুব একটা হয়নি, কারণ দুর্বল পারফরম্যান্স। ২০১৭ সালের পিএসএল ফাইনালে পেশোয়ার জালমির বিপক্ষে কোয়েটা গ্ল্যাডিয়েটর্সের হয়ে আনামুল হক বিজয়ের ৯ বলে ৩ এবং ২০২০ সালের পিএসএল ফাইনালে তামিম ইকবালের ইনিংসের সূচনায় নেমে ৩৮ বলে ৩৫ রানের ইনিংসের পর পিএসএল ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা বাংলাদেশের কোনো টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যানকে দলে নেওয়ার সাহস দেখাননি। এবার গত এক বছরে তামিম-ইমনদের পারফরম্যান্স নিশ্চয়ই খানিকটা আশা জুগিয়েছে তাদের, সেই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও দরজা খুলেছে। এবার যদি তারা ধারণাটা বদলে দিতে না পারেন, তাহলে হয়তো আবারও লম্বা সময়ের জন্যই বনে যেতে হবে দর্শক।
