জ্বালানি তেলের অভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নৌপথে পণ্য পরিবহন। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে অবস্থানরত মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করে দেশের বিভিন্ন নদীবন্দর এবং ঘাটে খালাসের কাজে নিয়োজিত লাইটার জাহাজগুলো (ছোট জাহাজ) চলাচল করতে পারছে না। আর এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে কয়লা পরিবহনে যেমন সমস্যা দেখা দিয়েছে তেমনিভাবে ভোগ্যপণ্য পরিবহনে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে তেল আমদানির উপাত্তে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন বেশি তেল এসেছে।
দেশের ৫টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য মাসে গড়ে সাড়ে ৮ লাখ টন কয়লা আমদানি হয়ে থাকে। এসব কয়লা বহনকারী মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়ায় অবস্থান করে থাকে। সেখান থেকে লাইটার জাহাজে করে বাঁশখালীর এস আলম প্ল্যান্টে, পায়রা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিবহনের জন্য মাসে প্রায় ১২০০ লাইটার জাহাজের প্রয়োজন হয়। কিন্তু একেকটি জাহাজ দুই বা তিন ট্রিপের মাধ্যমে কয়লাগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে দিয়ে থাকে।
কিন্তু এখন লাইটার জাহাজের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লা পৌঁছাতে পারছেন না বলে জানান বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট শফিকুল ইসলাম জুয়েল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়লা পরিবহনের জন্য আমি এখন জাহাজ পাচ্ছি না। আর এই না পাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ বলা হচ্ছে ডিজেল দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু এই ডিজেলের অভাবে আমি যদি লাইটার জাহাজে করে কয়লা পৌঁছাতে না পারি তাহলে তো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে না। তখন সারা দেশে লোডশেডিং বেড়ে যাবে এবং ব্ল্যাক আউটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এদিকে লাইটার জাহাজ পরিচালনায় নিয়োজিত বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মোহাম্মদ শফিক আহমেদ বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন যেখানে দরকার সাড়ে চার লাখ টন ডিজেল সেখানে গতকাল মঙ্গলবার দেওয়া হয়েছে মাত্র এক লাখ টন। সড়কপথে রাস্তার পাশে পেট্রোল পাম্প থেকে গাড়িগুলো তেল নিতে পারে। কিন্তু নৌপথে চট্টগ্রাম থেকে একবার তেল নিয়ে ঢাকা বা মোংলায় যায় এবং আবারও ফিরে আসে। অর্থাৎ যাওয়া-আসার তেল একসঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। এখন এই তেলের অভাবে আমরা লাইটার জাহাজ চালাতে পারছি না।
লাইটার জাহাজ না চালাতে পারলে সমস্যা কী হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এতে মাদারভেসেলগুলো বন্দরের বহির্নোঙরে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একদিন বেশি অপেক্ষা করলে কমপক্ষে ২০ হাজার মার্কিন ডলার বাড়তি পরিশোধ করতে হয়। আর দিন শেষে তা ভোক্তার ওপরেই বর্তাবে।
সড়কপথ ও নৌপথের পণ্য পরিবহনের খরচের তুলনা করতে গিয়ে ওয়াটার ট্রান্সপোর্টেশন সেলের অপর এক নেতা শেখ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সড়কপথে প্রতি টন পণ্য ঢাকায় নিতে খরচ হয় ২৫০০ টাকা, সেখানে নৌপথে খরচ হয় মাত্র ৫৫০ টাকা। এছাড়া এক টন পণ্যের জন্য নৌপথে ৩ দশমিক ২ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হলেও সড়কপথে ১০ থেকে ১২ লিটারের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ সড়কপথের তুলনায় নৌপথ সাশ্রয়ী।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেলের অবস্থানের সময় বেড়ে গেলে বন্দরকে বাড়তি ফি যেমন দিতে হবে তেমনিভাবে মাদার ভেসেলের মেইনটেনেন্স খরচও বেড়ে যাবে বলে শিপিং বিষয়ক প্রতিনিধিরা জানান। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, লাইটার জাহাজগুলোকে যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয় সেজন্য আমরা বিপিসি’কে (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) চিঠি দিয়েছি। তবে এটা ঠিক লাইটার জাহাজ না পাওয়া গেলে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস বিলম্বিত হবে।
ফেব্রুয়ারি-মার্চে ১০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল বেশি এসেছে
চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে প্রাপ্ত উপাত্তে দেখা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৭৭ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে। বিপরীতে চলতি মাসের গত মঙ্গলবার পর্যন্ত একই সময়ে আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫১ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের মুখপাত্র ও সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চের তুলনায় এবার একই সময়ে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল বেশি আমদানি হয়েছে এবং আমরা রাজস্বও বেশি আহরণ করেছি।
জ্বালানি তেলের পরিস্থিতি জানতে চাইলে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ বলেন, চলতি মাসে এ পর্যন্ত ১১টি জাহাজে জ্বালানি তেল এসেছে এবং আরও তিনটি জাহাজ ৩১ মার্চের মধ্যে আসার কথা রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী পাইপলাইনে থাকা তেল কিন্তু আমরা এখনো পাচ্ছি। তাই তেল নিয়ে এখনই শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
উল্লেখ্য, ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাস্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এই প্রণালি দিয়ে বিশে^র ২০ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে যারা তেল সরবরাহ করে তারাও এসব দেশ থেকে তেল আমদানি করে থাকে। এ জন্যই আমাদের মতো বিশে^র অনেক দেশই জ্বালানি তেল নিয়ে শঙ্কিত।
