ছাত্রাবস্থাতেই সফল ফ্রিল্যান্সার জসিম

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ১২:২০ এএম

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম চাকপাড়া। আধুনিক প্রযুক্তি, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট কিংবা উন্নত অবকাঠামো যেখানে এখনো সহজলভ্য নয়, সেখান থেকেই বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন মোদাসসেরুল হক জসিম। প্রান্তিক বাস্তবতার সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে তিনি প্রমাণ করেছেন- সঠিক দক্ষতা, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস থাকলে বিশ্ববাজারও জয় করা সম্ভব। তার এই পথচলা এখন অনেক তরুণের কাছে অনুপ্রেরণা।

ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি আগ্রহী ছিলেন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে, শিখতে। এসএসসি ও এইচএসসিতে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকার ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই ইন্টারনেট, গুগল ও ইউটিউবের সহায়তায় নিজ উদ্যোগে ফ্রিল্যান্সিং শেখা শুরু করেন। দীর্ঘ অনুশীলন, ব্যর্থতা ও অপেক্ষার পর ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের এক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পাওয়া ৫০ ডলারের একটি কাজই হয়ে ওঠে তার পেশাগত যাত্রা শুরুর প্রথম পদক্ষেপ। সেই ছোট্ট শুরুই ধীরে ধীরে তাকে আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশে কাজ করার আত্মবিশ্বাস এনে দেয়।

বর্তমানে তিনি একজন পেশাদার ওয়েব ডেভেলপার। আপওয়ার্ক ও ফাইভারে তিন শতাধিক আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করে সহস্রাধিকের বেশি প্রজেক্ট সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। অনলাইন কাজের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য অফলাইনেও প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্লায়েন্টের আস্থা অর্জনের মাধ্যমেই তিনি এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। সময়ের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি শেখা এবং কাজের মান ধরে রাখাকে তিনি সাফল্যের মূল ভিত্তি মনে করেন।

নিজের সাফল্যে থেমে না থেকে আশপাশের তরুণদের নিয়ে একটি ছোট টিম গড়ে তুলেছেন তিনি। অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার মাধ্যমে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন তরুণকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছেন। মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও তিনি সক্রিয় নিজের আয়ের একটি অংশ অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় করার চেষ্টা করেন। তার বিশ্বাস, একজন সফল মানুষের দায়িত্ব শুধু নিজের উন্নতি নয়, সমাজের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

ফ্রিল্যান্সিং খাত নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক। তার মতে, বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। এই খাত শুধু ব্যক্তিগত আয়ের উৎস নয়; বরং বেকারত্ব কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং টেকসই ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার একটি কার্যকর মাধ্যম। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে মানসম্মত প্রশিক্ষণের অভাব, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে জটিলতা, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সমস্যা এবং ইংরেজি দক্ষতার সীমাবদ্ধতা অগ্রযাত্রাকে ধীর করে দিচ্ছে।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কৌশলের আওতায় এনে অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সুবিধা সহজীকরণ এবং কার্যকর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এ খাত আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে বলে মনে করেন ফ্রিল্যান্সার জসিম।

যারা ফ্রিল্যান্সিং পেশায় সফল হতে চান তাদের উদ্দেশ্যে জসিম বলেন, ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফলতা লাভের কোনো শর্টকাট পথ নেই। ধৈর্য, নিয়মিত শেখা এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলাই এই কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি। তার বিশ্বাস, সঠিক দিকনির্দেশনা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেলে বাংলাদেশের তরুণরাই আগামী দিনে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে আরও বড় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

লেখক : সাংবাদিক, লেখক ও প্রযুক্তিবিদ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত