১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প, ভিক্টোরিয়া স্কয়ার, শাঁখারিপট্টি, ইপিআরের ঘাঁটি পিলখানা, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা আক্রান্ত হয়। ২৬ মার্চ সকালে রেডিওতে কারফিউ অব্যাহত থাকার কথা ঘোষণা করা হয়। রাত হলে আবারও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। নিরীহ বাঙালির ওপর এই আক্রমণের প্রতিবাদে এবং আত্মরক্ষার নিমিত্তে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয় বাঙালি। কিন্তু পাকিস্তানের এই ভূখ-ে যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চলেছিল সে সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কিছুই জানতে পারেনি বিশ্ববাসী। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর নানারূপ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে সেনাবাহিনীর দেশপ্রেম হিসেবে দেখার আহ্বান জানানো হয়। সামরিক বাহিনীর বিধিনিষেধের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সাংবাদিকই সে সময়ের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেননি। অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস তেমন একজন সাংবাদিক। তিনি এই হত্যাযজ্ঞ দেখে সিদ্ধান্ত নেন, এ বিষয়ে যা দেখেছেন তা লিখবেন আর তা যদি না পারেন তাহলে লেখালিখিই ছেড়ে দেবেন। লন্ডনের দি সানডে টাইমস কার্যালয়ে যোগযোগ করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটছে তার সত্য ঘটনা লিখতে চান বলে জানান। কিন্তু এই প্রতিবেদন প্রকাশ হলে পাকিস্তানে বসবাসকারী তার পরিবারের নিশ্চয়তা বিঘিœত হতে পারে সে দুশ্চিন্তাও ছিল। তিনি যেন পরিবারকে পাকিস্তান থেকে নিরাপদে বের করে নিয়ে আসতে পারেন সে বিষয়েও সহযোগিতা চান। অবশেষে তার পরিবার পাকিস্তান ত্যাগ করলে তিনি নিজেও পাকিস্তান ত্যাগ করে লন্ডনে পৌঁছান ও পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া রোমহর্ষক ঘটনা সবিস্তারে লিখতে আরম্ভ করেন। শুধু তিনি নন, পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া নারকীয় হত্যাযজ্ঞ নিয়ে ১৯৭১ সালে বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রতিবেদন লিখেছিলেন অনেক প্রতিবেদক। প্রবাসী বাঙালিরাও কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তাদের লেখনীর মাধ্যমে বিশ্ব জানতে পারে এ ভূ-খ-ের মানুষ কীভাবে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে প্রতিনিয়ত।
এই সাংবাদিকদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন বিদেশি। বিদেশি সাংবাদিকরা নিষেধাজ্ঞার শিকার অপেক্ষাকৃত কম হতেন। তা ছাড়া এই বিদেশি সাংবাদিকরা বিভিন্ন ভাষায় প্রতিবেদন প্রকাশ করে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের পক্ষে জনমত গঠনে সহায়তা করেন। তাদের লেখা প্রতিবেদনগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ইতিহাসের অংশ এই প্রতিবেদনগুলো মাহবুব কামাল অনুবাদ করে ‘বিদেশী সাংবাদিকের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থে রূপ দিয়েছেন।
এই বইয়ের প্রতিবেদনগুলো শুধু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে তেমন নয়। অনেক প্রতিবেদনে পাকিস্তানি শাসকদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞকে উল্লেখ করা হয়েছে বিদ্রোহীদের দমন কৌশল হিসেবে, রাষ্ট্রীয় অখ-তা রক্ষায় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে। বিশ্ববাসীর উপর্যুপরি চাপের মুখে ইয়াহিয়া খান, রাও ফরমান আলী, টিক্কা খান ও অন্য সেনাকর্তারা নিজেদের সাফাই দিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছিল, যা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল সে সময়। সে বক্তব্যগুলোও এই বইয়ে স্থান পেয়েছে।
পূর্ব পাকিস্তানি নির্বাচন, ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা এবং এর ফলে কী ধরনের পরিস্থিতি উদ্ভূত হতে পারে সে সম্পর্কে এ অঞ্চলের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানাতেন তাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে। সে সময়ের গোপন মার্কিন রিপোর্টও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এই বইয়ে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা অনস্বীকার্য। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে প্রায় এক কোটি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। তাদের থাকা, খাওয়া এবং নিরাপত্তা দিয়েছিল প্রতিবেশী দেশ ভারত। গঠিত মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রশস্ত্রের জোগানও দেয় ভারত। এর জন্য সরকার যেমন নন্দিত হয়েছে, তেমনি নিন্দিত হয়েছে। মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে নন্দিত হয়েছে কারও কাছে আবার কেউ কেউ সমালোচনা করেছেন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যমান পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করতে ইন্দিরা গান্ধী এক সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকারটি সদ্যগঠিত বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ‘বিদেশী সাংবাদিকের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ বইতে স্থান পেয়েছে সেই সাক্ষাৎকারটিও।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে প্রবাসী বাঙালির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এতে পুরোধা হিসেবে ছিলেন আবু সাইদ চৌধুরী। তার দেওয়া বিভিন্ন বিবৃতিও স্থান পেয়েছে এই বইতে।
বইটি পাঠ করলে তোমরা বুঝতে পারবে বাংলাদেশের জন্ম ও মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি বৈশি^ক ঘটনা। ভূরাজনীতি ও বিশ্বরাজনীতি স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। আর অনুভব করবে বাংলাদেশের জন্ম কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।
সুলতানা রাজিয়া