এক হাতে মেয়ে, আরেক হাতে জীবন সাঁতরে পন্টুনে উঠেই শাকিলা বেগম বলেছিলেন, ‘ভাই, আমার মেয়েটাকে ধরেন, আমি ছেলেকে নিয়ে আসি।’ কিন্তু তাকে আর নামতে দেওয়া হয়নি। কারণ সবাই বুঝেছিল ডুবন্ত বাসে ফিরে গেলে, তিনি আর বাঁচবেন না। এই কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্তই হয়তো বাঁচিয়ে দিয়েছে শাকিলার মেয়েকে। কিন্তু কেড়ে নিয়েছে ছেলেকে। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে গত বুধবার বিকেলের দুর্ঘটনা এখন শুধু একটি সংখ্যা নয় এটি একাধিক ভাঙা পরিবারের গল্প, আর তার সবচেয়ে নির্মমতার সাক্ষী শাকিলা বেগমের পরিবার।
ঈদের ছুটিতে বাবার বাড়ি এসেছিলেন নিশি আক্তার। ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পথে ভাবি শাকিলা বেগম, তার ছেলে সাবিত (৮), মেয়ে সাবিহা, নিশি ও নিশির একমাত্র মেয়ে সোহানাকে (১০) নিয়ে তারা রওনা হন। সাধারণ এক যাত্রা, কিন্তু শেষ হয়ে যায় এক ট্র্যাজেডিতে। দৌলতদিয়া ঘাটে ঢাকাগামী একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তেই চিৎকার, আতঙ্ক, আর পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া মানুষের অসহায়তা সব মিলিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
বাসটি নদীতে পড়ার পর যেভাবে পেরেছেন সেভাবেই লড়াই শুরু করেন শাকিলা। এক হাতে ছোট মেয়ে অন্য হাতে পানির সঙ্গে যুদ্ধ।
প্রতিবেশী মরিয়ম আক্তার বলেন, ‘ওই অবস্থায়ও শাকিলা প্রথমে মেয়েটাকে বাঁচিয়েছে। সাঁতরে পন্টুনের কাছে এসে লোকজনকে বলছিলেন, মেয়েটাকে ধরেন, আমি ছেলেকে নিয়ে আসি।’ কিন্তু তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়। পন্টুনে থাকা মানুষগুলো জানতেন আরেকবার পানিতে নামা মানে নিশ্চিত মৃত্যু। শাকিলা ও তার মেয়েকে টেনে তোলা হয়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি জ্ঞান হারান। তখনই নিশ্চিত হয়ে যায়, ছেলে সাবিত আর ফিরবে না।
এই দুর্ঘটনায় মারা গেছে সাবিত (৮) এবং সোহানা (১০)। দুজনেই ছিল পরিবারের সবচেয়ে উজ্জ্বল হাসির নাম। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আগমাড়াই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, দুই শিশুর মরদেহ পাশাপাশি রাখা। চারদিকে মানুষের ভিড়, কিন্তু শব্দ নেই শুধু কান্না আর ভারী নিস্তব্ধতা। বাবা শরিফুল ইসলাম সন্তানের পাশে বসে আছেন, মাথা নিচু। কখনো কাঁদছেন, কখনো নির্বাক। শাকিলা যিনি নিজের হাতে মেয়েকে বাঁচিয়েছেন তিনি যেন নিজের ভেতরেই ভেঙে পড়েছেন। মাঝে মাঝে ছেলের নাম ধরে চিৎকার করছেন, তারপর স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছেন।
নিশি আক্তার যিনি ঢাকায় গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করেন, হারিয়েছেন একমাত্র মেয়ে সোহানাকে। তার কান্না যেন শুকিয়ে গেছে।
কখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছেন, কখনো হঠাৎ জ্ঞান হারাচ্ছেন। এ এমন এক শোক, যার ভাষা নেই।
শাকিলার স্বামী শরিফুল ইসলাম একজন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী। ছোট্ট সংসার; স্বাভাবিক, শান্ত, স্বপ্নভরা। সেই সংসারে একদিনেই নেমে এসেছে অন্ধকার। স্বজন সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এমন দৃশ্য দেখা যায় না। একটা সুখী পরিবার শেষ হয়ে গেল চোখের সামনে।’
