মানুষের অন্তর্জগৎ রহস্যে ঘেরা, যেখানে প্রতিনিয়ত প্রবৃত্তির সঙ্গে বিবেকের অদৃশ্য লড়াই চলে। এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়া যেমন সম্মানের, তেমনি পরাজিত হওয়া মানেই ভয়ানক আত্মিক পতন। আমরা অনেক সময় বাহ্যিক শত্রু নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকলেও আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু যে আমাদের নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে, তা প্রায়ই ভুলে যাই। এই অদৃশ্য শত্রুই হলো নফস বা কুপ্রবৃত্তি, যা মানুষকে কেবল সাময়িক ও নশ্বর মোহের মায়াজালে আবদ্ধ করতে চায়। শয়তানের কুমন্ত্রণা কোনো উচ্চকিত গর্জন নয়, বরং তা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিঃশব্দে হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে মানুষের চিন্তা ও কল্পনাকে কলুষিত করে তোলে। এই মোহময় পৃথিবীর চাকচিক্য ও রঙের খেলায় মজে গিয়ে মানুষ যখন তার আসল গন্তব্য হারিয়ে ফেলে, তখনই সে শয়তানের সহজ শিকারে পরিণত হয়। আত্মনিয়ন্ত্রণ কেবল একটি সাধারণ গুণ নয়, বরং এটি মহান রবের পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত, যা কেবল সচেতন ও বিশ্বাসী অন্তরেই বাসা বাঁধে।
নফস সম্পর্কে মানুষের জানার আগ্রহের অন্ত নেই। বিশেষ করে, যারা আধ্যাত্মবাদ নিয়ে চর্চা করেন তাদের কাছে নফসের আলোচনা খুবই গুরুত্ব বহন করে। নফস এমন একটি সূক্ষ্ম জিনিস, যা কেবল পার্থিব ভোগবিলাস ও মায়ামোহের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করে।
আমরা জানি, মানুষের মন সবসময় মন্দ কাজের দিকে ধাবিত হয়। জাগতিক সুখ-শান্তির ধোঁকায় পড়ে মানুষ পরকালীন জীবনের অসীম ও অনন্ত সুখকে ইহকালের ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। অতঃপর খালি হাতে প্রভুর দিকে ধাবিত হয়।
কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রবৃত্তি মন্দের দিকে ঝুঁকে থাকে, কিন্তু তার কথা আলাদা। যার প্রতি আমার প্রভু দয়া করেন।’ (সুরা ইউসূফ ৫৩) নফসের কুপ্রবৃত্তির পথ হলো, আল্লাহতায়ালার লানত তথা শয়তানের পথ। অভিশপ্ত শয়তানের কাজ মানুষকে ধোঁকা দেওয়া বা বিপথগামী করা। শয়তান যতক্ষণ পর্যন্ত না একজন মুমিন বান্দাকে বিভ্রান্ত করতে পারবে, সে ততক্ষণ পর্যন্ত পার্থিব সুখ-শান্তি ও রঙ-তামাশাকে মানুষের চোখের সামনে নানাভাবে তুলে ধরতে থাকে।
কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা পুরোপুরিভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং কোনো অবস্থায়ই শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, কেননা শয়তান হচ্ছে তোমাদের প্রকাশ্যতম দুশমন!’ (সুরা বাকারা ২০৮)
শয়তানের কুমন্ত্রণা সম্পর্কে সজাগ না
থাকলেই বিপদের সম্ভাবনা। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হলো, আল্লাহতায়ালার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং অশ্লীল কাজ থেকে দূরে থাকা। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘কখনো যদি শয়তান কুমন্ত্রণায় আপনাকে প্ররোচিত করে, সঙ্গে সঙ্গে আপনি আল্লাহতায়ালার কাছে আশ্রয় চান।’ (সুরা আরাফ ২০০)
কোরআনের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, ‘আপনি বলুন, আমি উজ্জ্বল প্রভাতের প্রভুর কাছে আশ্রয় চাই, তার সৃষ্টি করা অনিষ্ট থেকে। আমি আশ্রয় চাই রাতের অনিষ্ট থেকে, যখন রাত তার অন্ধকার বিছিয়ে দেয়। গিরায় ফুঁক দিয়ে জাদু টোনাকারিণীদের অনিষ্ট থেকে। হিংসুক ব্যক্তির অনিষ্ট থেকেও যখন সে হিংসা করে।’ (সুরা ফালাক ১-৫)
কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি বলুন, আমি আশ্রয় চাই মানুষের সৃষ্টিকর্তার কাছে। মানুষের বাদশাহর কাছে। মানুষের মাবুদের কাছে। কুমন্ত্রণাদানকারী অনিষ্ট থেকে, যে গা ঢাকা দেয়। যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। জিনদের মধ্য থেকে মানুষের মধ্য থেকে হোক।’ (সুরা নাস ১-৬)
আত্মশুদ্ধি অর্জনকারী ব্যক্তি ইনসানে কামেল তথা পরিপূর্ণ মানুষ। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে মানুষের মধ্যে সেই সফলকাম যে তাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর যে তাকে কলুষিত করেছে সে ব্যর্থ হয়েছে।’ (সুরা শামস ৯-১০) কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হযেছে, ‘যে ব্যক্তি তার মনের লোভ-লালসা থেকে বিরত রয়েছে তারাই সফলকাম হবে।’ (সুরা তাগাবুন ১৬) আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক মুসলমানকে নফসের কুপ্রবৃত্তি থেকে বেঁচে আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক