যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরানের সঙ্গে নেপথ্যের আলোচনা ‘ভালোই চলছে’। এমন দাবির পাশাপাশি তার দেশ জলে-স্থলে চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছে। আর প্রতিপক্ষও বসে নেই। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সৈন্যদের সামনাসামনি মোকাবিলা ছাড়াও যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিতে চলেছে ইরানিরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের সামনাসামনি আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে নেপথ্যের আলোচনা কিছুটা যে চলছে, এটা বোঝা যায় দুপক্ষই একে অন্যকে ছোট ছোট ছাড় দেওয়া দেখে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকার অনুরোধে ইরান ১০টি জাহাজকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে দিয়েছে। আর তিনি ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা আরও ১০ দিন স্থগিত রাখার কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আগ্রাসন শুরুর পর ইরানের কঠোর অবস্থানের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিসহ সব পণ্য পরিবহনে গত চার সপ্তাহ ধরে প্রায় অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
হরমুজ প্রণালি খোলার ঘোষণা পাঁচ দিনের মধ্যে না দিলে ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় বড় রকমের হামলার হুমকি ট্রাম্প দিয়েছিলেন গত সোমবার। এ সময়সীমা গতকাল শুক্রবার শেষ হয়েছে। আর নতুন ঘোষণার ১০ দিন শেষ হবে আগামী ৬ এপ্রিল রাত ৮টায়।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি চলমান হালকা চাপে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ইরান তুলে নাও নিতে পারে, এমন বিবেচনা থেকে দেশটিতে চূড়ান্ত হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এতে চলমান বিমান হামলার পাশাপাশি জলে ও স্থলে যুদ্ধ পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে।
আমেরিকার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে। প্রায় এক মাস ধরে চলমান এ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় রেখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য নতুন সামরিক বিকল্প গ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে এ অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানো হতে পারে। এ সৈন্যরা অঞ্চলটিতে আগে মোতায়েন করা কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার ও মেরিন সেনার সঙ্গে যোগ দেবে। অতিরিক্ত সৈন্যদের ঠিক কী কাজে লাগানো হবে, বার্তা সংস্থা এএফপির এমন প্রশ্নে পেন্টাগন সাড়া দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মনে করেন, যুদ্ধ শেষ করতে শক্তি প্রদর্শন ‘শান্তি আলোচনায়’ বাড়তি সুবিধা দেবে অথবা ট্রাম্পের নিজেকে বিজয়ী ঘোষণার একটি সুযোগ এনে দিতে পারে। তারা এটাও মনে করেন, যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, সে বিষয়ে ইরানেরও ভূমিকা থাকবে। ইরানিরা উল্টো দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র ঝুঁকির যুদ্ধে যেতে চাইলে নাটকীয়ভাবে যুদ্ধ শেষ করতে ট্রাম্পের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে। এ কারণে একের পর এক বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে।
ট্রাম্পের সামনে এখন চারটি বিকল্প দেখছেন তারা। তিনি এর যেকোনো একটি বা একাধিক বেছে নিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানিকেন্দ্র খারগ দ্বীপ আক্রমণ অথবা অবরোধ করা। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লারাক ও আবু মুসা দ্বীপ ছাড়াও আরও দুটি ছোট দ্বীপ দখল করে হরমজু প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা। ছোট দ্বীপ দুটির মালিকানা নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। হরমুজ প্রণালির পূর্বপাশে ইরানের তেল পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজ জব্দ করা হতে পারে।
এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় বড় ধরনের বিমান হামলার পাশাপাশি গভীর স্থল অভিযান পরিচালনা করা হতে পারে। ট্রাম্প ইরানিদের সতর্ক করেছেন, ‘শান্তি চুক্তি’ না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইরানিরা কী ভাবছে : ইরানের কর্মকর্তারা জানান, তাদের ভূখন্ডে স্থল অভিযান চালানো হলে আমেরিকার সৈন্যদের মোকাবিলার জন্য ১০ লাখ সৈন্য প্রস্তুত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুদ্ধটি সর্বাত্মক হতে পারে। এর বাইরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সক্রিয় করে লোহিত সাগরের মুখে অবস্থিত ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি ওই অঞ্চলে জাহাজে হামলা চালানো হবে। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান চাতুর্যের সঙ্গে নিজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধটি পুরো পারস্য উপসাগরে ছড়িয়ে দিয়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ বিঘিœত হওয়ার প্রভাব পড়েছে বিশ^ জুড়ে। হুতিরা ইরানপন্থি হিসেবে পরিচিত। এ যুদ্ধে এখনো নীরব থাকা হুতিরা ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটালে সামরিক ব্যবস্থার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের এ যুদ্ধে আরেকটি নতুন রণক্ষেত্র তৈরি হবে।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাধারণ মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিসহ যেখানেই আমেরিকার সৈন্য আছে, সেই এলাকাগুলো দ্রুত খালি করতে বলেছে। আইআরজিসি বলছে, আমেরিকার সেনাদের ‘যেখানেই পাওয়া যাবে’ হামলা চালানো হবে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রায় ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন ছিল। ইরানের পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি ঘাঁটি ‘বসবাসের অযোগ্য’ হয়ে গেছে। এতে যুদ্ধবিমানের পাইলট, বিমান পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ক্রুরা ছাড়া স্থলবাহিনীর বড় অংশকে মূল ঘাঁটি থেকে দূরবর্তী স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। তবে ইরানের দাবি, তাদের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক ঘাঁটির সব ধ্বংস হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান সুকৌশলে পাল্টা হামলা চালিয়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সমর-পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। এ ছাড়া সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটিকে নতুন করে সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে আনতে হচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র চালকবিহীন ‘ড্রোন স্পিডবোট’ মোতায়েনসহ আরও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করছে। এ ড্রোন-বোটগুলোয় বিস্ফোরক যুক্ত করা হলে নজরদারির পাশাপাশি আত্মঘাতী অভিযানে ব্যবহার করা হতে পারে।
হামলা অব্যাহত : যুদ্ধরত পক্ষগুলো জ্বালানি স্থাপনায় হামলা আপাতত বন্ধ রাখলেও পরস্পরের ওপর অন্যান্য ক্ষেত্রে হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের কোম শহরে আবাসিক এলাকায় শুক্রবার সকালে ইসরায়েলের বিমান হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১০ জন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের গত চার সপ্তাহের হামলায় ইরানে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ কমপক্ষে ১ হাজার ৯০০ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আহত প্রায় ২০ হাজার ইরানি।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ইরানে হামলা আরও জোরদার করার হুমকি দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে পূর্ণ শক্তি দিয়ে অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবে প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় ড্রোন হামলা হয়েছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, দুটি ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়েছে। এ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান ক্রমাগত এ অঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে।
হাড় হিম করা বীভৎসতা : আগ্রাসনের প্রথম দিন ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে শাজারাহ তাইয়েবাহ এলিমেন্টারি স্কুলে চালানো বোমা হামলাকে ‘হাড় হিম করা বীভৎসতা’ (ভিসারাল হরর) হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক। এ হামলায় ১৭৫ জন প্রাণ হারায়, যাদের বেশিরভাগ ছিল শিশু ও তাদের শিক্ষক।
ফলকার টুর্ক বলেন, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ধরনের বোমবর্ষণ অমানবিক। যারা এ ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার দায়ভার তাদের নিতে হবে।