পদ্মাপাড়ে এখনো চলছে আহাজারি

রিপনের খোঁজে চলবে অভিযান

বাসের লাইসেন্স স্থগিত

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় নিহত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করে ইতিমধ্যে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রিপন নামের এক ব্যক্তির সন্ধানে গতকাল শুক্রবার তৃতীয় দিনের মতো চলেছে উদ্ধার অভিযান। তবে তার খোঁজ মেলেনি। বিকেলে তৃতীয় দিনের অভিযান শেষ করা হয়। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ওই একজনের সন্ধানেই আজ শনিবার ও আগামীকাল রবিবারও চলবে উদ্ধার অভিযান।

গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে প্রায় অর্ধশত যাত্রী-আরোহী নিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস। তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকজন জানালা-দরজা দিয়ে লাফিয়ে নামতে পারলেও বেশিরভাগ যাত্রীসহ বাসটি মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে যায় নদীতে। সেদিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিআইডব্লিউটিসি, ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের চেষ্টায় বাসটি পন্টুনে তোলা হয়। সে সময় নারী ও শিশুসহ ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাস উদ্ধারের পরেও  নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যায় উদ্ধারকারী দল। গত বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নিখোঁজ রিপন বালিয়াকান্দি উপজেলার শ্যামসুন্দরপুর গ্রামের বাসিন্দা। রিপন ওই বাসের যাত্রী ছিলেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও তার পরিবার নিশ্চিত যে তিনি ওই সময়েই ঘাট এলাকায় ছিলেন। তিনি রাজবাড়ী নতুন বাজার এলাকা থেকে সোহার্দ্য পরিবহনে উঠেছিলেন। দুর্ঘটনার পর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল ঘাট এলাকায় রিপনের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় ছিলেন তার স্বজনরা। পদ্মার ঢেউয়ের শব্দ ছাপিয়ে থেকে থেকে শোনা যাচ্ছিল রিপনের স্বজনদের আর্তনাদ।

গতকাল ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত ১২ সদস্যের একটি চৌকস ডুবুরি দল সকাল থেকেই নদীর তলদেশে তল্লাশি চালিয়েছে। বিকেলে শেষ হয়েছে সেই অভিযান। রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, আমরা নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। যদিও নিখোঁজের বিষয়টি এখনো দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত নয়, তবুও পরিবারের দাবি অনুযায়ী সম্ভাব্য প্রতিটি পয়েন্টে আমাদের ডুবুরিরা কাজ করছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো কিনারা না হচ্ছে, আমাদের অনুসন্ধান থামবে না।

তিনি জানান, নদীর গভীরতার কারণে উদ্ধারকাজ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। আগামী দুদিন অর্থাৎ শনি ও রবিবার এই অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শনিবার যদি নদীর তলদেশে কোনো হদিস না মেলে, তবে উদ্ধারকারী দল তাদের অনুসন্ধানের পরিধি আরও বাড়িয়ে ভাটির দিকে (নিম্নাঞ্চল) তল্লাশি চালাবে। সেদিনও সন্ধান না পাওয়া গেলে রবিবার ডুবুরিদের পাশাপাশি স্থানীয় জেলেরা এবং নৌ-পুলিশের টহল দলগুলো দীর্ঘ সীমানা জুড়ে নজরদারি রাখবে। সাধারণত ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর নিখোঁজ দেহ ভেসে ওঠার সম্ভাবনা থাকে, তাই আগামী দুদিন নদীর পাড়ে প্রশাসনের কড়া নজরদারি থাকবে।

নিজের হাতে বড় করা ভাতিজাকে নিজের হাতেই কবর :

এদিকে দুর্ঘটনায় নিহত কাজী সাঈফ আহমেদ সৌম্য (৩০) ও তার স্ত্রী জহুরা অন্তির (২৭) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। কাজী সাঈফ আহমেদ সৌম্য রাজবাড়ী পৌর শহরের সজ্জনকান্দা গ্রামের কাজী মুকুলের ছেলে। তিনি রাজধানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। স্ত্রী জহুরা অন্তি একই এলাকার মৃত ডা. আব্দুল আলীমের মেয়ে। অন্তি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ইন্টার্ন করছিলেন।

নিহত সৌম্যের বড় চাচা কাজী গোলাম আহমেদ বলেন, সৌম্য তার সেজো ভাইয়ের একমাত্র ছেলে। তবে তিনিই লালন-পালন করে সৌম্যকে বড় করেছেন। পড়ালেখা শিখিয়েছেন। সাড়ে তিন মাস আগে নিজের হাতে তাকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন নিজে দাঁড়িয়ে তাদের জানাজা পড়ালেন। নিজের হাতে কবর দিয়েছেন। এই শোক তিনি কী করে সইবেন জানেন না।

বাসের লাইসেন্স স্থগিত :

এদিকে সৌহার্দ্য পরিবহনের সেই বাসের রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বিআরটিএ কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল দুপুরে জেলা প্রশাসন থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিআরটিএ রাজবাড়ী সার্কেলের সহকারী পরিচালক (অ.দা.) মুহাম্মদ অহিদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনাকবলিত স্থান পরিদর্শনপূর্বক সৌহার্দ্য পরিবহনের রাজবাড়ী-১১-০০২৪ নম্বরের বাসটির রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলো। একই সঙ্গে বাসটির রেজিস্ট্রেশন সনদ, ট্যাক্স টোকেন সনদ, ফিটনেস সনদ, রুট পারমিট সনদ ও বাসটির চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বিআরটিএ কার্যালয়ে হাজির হয়ে কেন এই যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন স্থায়ীভাবে স্থগিত করা হবে না সে বিষয়ে বক্তব্য প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যথায় বাসটির রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে চিঠিতে বলা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত