আলুতে বদহজম!

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ১২:২২ এএম

বিপাকে আলুচাষি ও সরকার। আলুচাষিরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। আবার সরকারের নীতি অনুয়ায়ী ভর্তুকি দেওয়ার কথা, তাও তারা দিচ্ছে না। ফলে এই ফসল নিয়ে বিপাকে থাকা চাষিদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। গত বছরও তারা এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। এ বছরও সেই অবস্থা অব্যাহত থাকায় আলু এখন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে পড়েছে। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১৫-১৬ টাকা। আর পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে ৪ থেকে ৮ টাকা দরে। এতে বিনিয়োগের অর্ধেকই গচ্চা যাচ্ছে। একজন কৃষকের আর্থিক অবস্থা কতটা ধসে পড়ে, তা ক্ষমতাবানদের উপলব্ধিতে কোনোরকম আলোড়ন তোলে না। অথচ মানুষের প্রধান খাদ্য ধান-চালের পরই এই আলু খাদ্য হিসেবে বিশেষ অবদান রাখে। আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম উৎস আলু, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য ফল-ফসলাদির উৎপাদন লক্ষ্য পূরণ করা না গেলে, সংকট ঘনীভূত হতে বাধ্য। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করার চেষ্টা করছি। খাদ্যের বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন উৎস যেমন মাছ, মাংস, দুধ, ডিম প্রভৃতির জোগান দেওয়া জরুরি। অথচ ডিম, দুধ, মাছ ও মাংসের মধ্যে পুষ্টিকর খাদ্য উপকরণ উৎপাদনে আমাদের ঘাটতি বিপুল পরিমাণ।

খাদ্য হিসেবে গম উৎপাদনের ওপর সরকার যতটা জোর দেয়, মৎস্য উৎপাদনে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, ততটা দেওয়া হয় না দুধ, ডিম ও মুরগি উৎপাদনে। দেশীয় মুরগি উৎপাদনে বিশেষ আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দান করে উৎপাদনকে চাহিদার স্তরে নিয়ে যেতে হবে। প্রণোদনা কেবল মৌখিক হলে চলবে না, দেশীয় মুরগি উৎপাদনে প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি পরিবারকে ছোট খামারের আওতায় আনতে হবে। বিদেশি মুরগি ফার্মের রোগবালাই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর, এটা আমরা জানি। এ ক্ষেত্রে তা পরিহার করতে হবে। ঠিক একই পদ্ধতি আরোপ করে আলুচাষিদের উৎপাদন যাতে ব্যয়বহুল না হয়, সেজন্য এর উৎপাদন সংশ্লিষ্ট উপাদান-উপকরণে সরকার ভর্তুকি দেবে, না হলে প্রতি বছরই চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়বে। কোল্ডস্টোরেজের আলু সংরক্ষণ একটি পদ্ধতি হলেও, চাষিদের জানা লোকাল পদ্ধতি অনেকটা কম খরচে করা সম্ভব। এই পদ্ধতিকে প্রণোদিত করা হলে আলু রক্ষা সহজ হবে। আমাদের মৌলিক সংকট যে খাদ্য, এটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এই সংকট যতটা না স্বাভাবিক, তারও চেয়ে বেশি হোলসেলার, মজুদদার ও পাইকারি বিক্রেতাদের অতিলোভের মধ্যে আটকে আছে।

যে সিন্ডিকেটের কথা বলা হয়, তা মূলত মজুদদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের নিজস্ব সিন্ডিকেট। যারা মাঠ স্তর থেকে ৪ থেকে ৮ টাকায় কিনে এনে ঢাকা মহানগরে ২০ টাকা দরে কিনতে বাধ্য করছে, তারাই আসল কুচক্রী। পরিবহন খরচ যোগ করে তারা ৮ টাকায় খুচরা দোকানির কাছে বিক্রি করতে পারে। আর খুচরা দোকানি ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করলে তা স্বাভাবিক হবে। এই অস্বাভাবিক মুনাফার লোভের জিহ্বা টেনে ধরতে হলে সরকারকে পাইকারি সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। প্রয়োজনে সরকার নিজেও টিসিবি ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আলু কিনে রাখতে পারে। প্রণোদনা হিসেবে দিতে পারে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি। সেটি আর্থিক ও অন্যান্য উপকরণ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। আলুর বহুমুখী ব্যবহারের পথ সৃষ্টি করতে হবে। গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মত নিয়ে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে। আর্থিক ভর্তুকির পাশাপাশি আলুর বহুমুখী ব্যবহার এবং রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের সাংবৎসরিক প্রয়োজন ৯০ লাখ টন বাদে, বাড়তি আলু রপ্তানির জন্য চেষ্টা করা যায়। খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি মনে রেখে সরকার পদক্ষেপ নিলে সুফল আসবে। আলুচাষির জন্য প্রণোদনা আমরা সরকারের কাছে চাই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত