জ্বালানি ছাড়াও বিশ্ব জুড়ে খাদ্য ওষুধে হরমুজের প্রভাব

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫৮ এএম

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। শুধু জ্বালনি নয় হরমুজের প্রভাব পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক খাতে। মূলত এ পথ ধরে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে রাসায়নিক, গ্যাস এবং ওষুধ পণ্য। এখন পথটি অবরুদ্ধ হওয়ায় এসব পণ্যের রপ্তানি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধের দাম বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সহসাই এ যুদ্ধ বন্ধ না হলে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে অন্যান্য পণ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। সংঘাতের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ চলাচল করত, এখন তা কমে মাত্র কয়েকটিতে নেমে এসেছে। এতে খাদ্য থেকে শুরু করে স্মার্টফোন ও ওষুধ পর্যন্ত নানা পণ্যের দাম প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিবিসি সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পেট্রোকেমিক্যাল তেল ও গ্যাস থেকে তৈরি হয়। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এগুলো বিপুল পরিমাণে উৎপাদন ও রপ্তানি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো সার, যা বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যাবশ্যক। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার, যেমন ইউরিয়া, পটাশ, অ্যামোনিয়া ও ফসফেটবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে এই প্রণালি দিয়ে সারসংশ্লিষ্ট পণ্যের রপ্তানি ব্যাপক হারে কমেছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, উত্তর গোলার্ধে পৃথিবীর অধিকাংশ স্থলভাগ। এর আওতায় চার মহাদেশের মধ্যে সমগ্র উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া মহাদেশের সিংহভাগ এবং আফ্রিকা মহাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ অবস্থিত। চলতি মার্চ ও এপ্রিল মাসে উত্তর গোলার্ধে ফসলের চাষ মৌসুম। ফলে এখন কৃষকরা কম সার ব্যবহার করলে বছরের শেষে ফলন কমে যাবে। এই সারগুলোর ঘাটতি বিশেষভাবে কৃষি উৎপাদনে ক্ষতি হতে পারে।

জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিল ইনস্টিটিউটের গবেষকদের মতে, স্বল্প সময়ের জন্য প্রণালি বন্ধ থাকলেও পুরো একটি চাষ মৌসুম ব্যাহত হতে পারে, যার ফলে খাদ্য নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে, প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার পরও এর প্রভাব থাকবে।

প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বলছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বে গমের দাম ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ফল ও সবজির দাম ৫ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। খাদ্যমূল্যের সামগ্রিক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হতে পারে জাম্বিয়ায় ৩১ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৫ শতাংশ, তাইওয়ানে ১২ শতাংশ এবং পাকিস্তান ১১ শতাংশ।

জানা গেছে, বিশে^ সার রপ্তানির পাঁচভাগের এক ভাগ রাশিয়া রপ্তানি করে থাকে। তবে চলমান সময়ে দেশটি সারের উৎপাদন বাড়াতে পারে।

হিলিয়াম : বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিলিয়াম গ্যাস কাতার থেকে আসে। এই গ্যাস হরমুজ প্রণালি হয়ে পরিবাহিত হয়। এটি প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের উপজাত। সেমিকন্ডাক্টর ওয়েফার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যেগুলো পরে কম্পিউটার, যানবাহন ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত মাইক্রোচিপে রূপান্তরিত হয়। হিলিয়াম হাসপাতালের এমআরআই স্ক্যানারের চুম্বক ঠা-া রাখতেও এটি ব্যবহৃত হয়।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর কাতারের বৃহৎ রাস লাফান প্ল্যান্টের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্ল্যান্টে মূলত এই গ্যাস তৈরি হয়। কাতার সরকার জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। এতে গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এর আগে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন সতর্ক করেছিল, বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ‘দাম বেড়ে যেতে পারে’। এদিকে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাধার প্রভাবে স্মার্টফোন থেকে ডেটা সেন্টার পর্যন্ত নানা আধুনিক প্রযুক্তির মূল্য বাড়তে পারে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের বৈশ্বিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সিনিয়র ফেলো প্রশান্ত যাদব সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি হিলিয়াম সংকটে এমআরআইয়ের খরচও বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘এমআরআই মেশিনে চুম্বক ঠান্ডা রাখতে দেড় থেকে দুই হাজার হিলিয়াম প্রয়োজন হয়। প্রতিবার স্ক্যান করার সময় এর কিছু অংশ বাষ্প হয়ে উবে যায়। মানুষ সাধারণত মনে করে হিলিয়ামের প্রধান ব্যবহার ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে এমআরআই ও অন্যান্য চিকিৎসা ক্ষেত্রেও হিলিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমলেও বাংলাদেশে বর্তমানে হিলিয়াম গ্যাসের কোনো ঘাটতি নেই।

পেট্রোকেমিক্যাল উপপণ্য (ওষুধ) : মিথানল ও ইথিলিনের মতো পেট্রোকেমিক্যাল থেকে উৎপন্ন উপপণ্য বৈশ্বিক ওষুধ উৎপাদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক ও ভ্যাকসিন উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।

গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত দেশগুলো সৌদি আরব, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন বিশ্বের মোট পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই দেশগুলো সাধারণত হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে এসব রাসায়নিক বিশ্বে রপ্তানি করে, যার প্রায় অর্ধেক যায় এশিয়ায়।

ভারত বিশ্বে জেনেরিক (ব্র্যান্ডবিহীন) ওষুধ রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ উৎপাদন করে, যার অনেকটাই পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পাঠানো হয়। এই ওষুধগুলোর বড় অংশ সাধারণত দুবাইসহ উপসাগরীয় বিমানবন্দর দিয়ে সরবরাহ করা হয়, যা সংঘাতের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধের দাম বাড়তে পারে।

ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামাল গন্ধকও অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণের উপজাত। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে এটি বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত হয়ে রপ্তানি হয়। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত গন্ধকের প্রায় অর্ধেকই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়।

গন্ধকের প্রধান ব্যবহার কৃষিতে সার হিসেবে হলেও, ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গন্ধক দিয়ে সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরি হয়, যা তামা, কোবাল্ট ও নিকেল প্রক্রিয়াজাতকরণে এবং লিথিয়াম উত্তোলনে ব্যবহৃত হয়। এই সব ধাতুই ব্যাটারি তৈরিতে প্রয়োজন হয়, যা গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ড্রোনের মতো সামরিক সরঞ্জামেও ব্যবহৃত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, গন্ধকের সরবরাহ ব্যাহত থাকলে ব্যাটারি-নির্ভর পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত