হামে মহাবিপদে শিশুরা

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

বেডে জায়গা হয়নি। দুই জমজ সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার গোলখালী গ্রামের গৃহবধূ আসমা বেগমের ১৪ মাস বয়সী দুই ছেলে আলফি ও রাফিলকে। পটুয়াখালীতে হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিড়ে উপচে পড়ছে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড। শয্যা সংকট এতটাই প্রকট যে, এক বেডে দুই থেকে চারজন শিশুকে রাখতে হচ্ছে। অনেককে আবার মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শুধু পটুয়াখালীর নয়, দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোর চিত্রও এমন।

হঠাৎ করেই মার্চে মহাবিপদের সম্মুখীন হয়েছে শিশুরা। তাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড। চরম ভোগান্তি, বেকায়দা, আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। সেই সঙ্গে উদ্বেগের শেষ নেই স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বশীলদের। তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আসমা বেগম বলেন, ‘প্রথমে আলফির ঠা-া জ¦র হয়। পরে শরীরে লাল গুটি বের হয়। খুব কষ্ট পাচ্ছিল। এরপর আরেক ছেলে রাফিলও জ¦রে আক্রান্ত হয়। পরে হাসপাতালে এনে ভর্তি করেছি। কিন্তু বেড না থাকায় মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে।’

পটুয়াখালী সংবাদদাতা শংকর লাল দাস জানান, মার্চ মাস জুড়ে জেলায় হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ১ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত ৪৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছেন আরও একজন। সব মিলিয়ে জেলায় বর্তমানে ৪৫ জন হামে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দুমকি উপজেলার মুরাদিয়া গ্রামের শিলা আক্তার তার ৯ মাস ১৫ দিনের ছেলে তানজীমকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে আছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে প্রচণ্ড জ¦র ছিল। কখনো ১০২ আবার কখনো ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছে। পরে শরীরে লাল গুটি দেখা দেয়। হাসপাতালে এনে ভর্তি করেছি। কিন্তু বেড না থাকায় চারটি শিশুকে একসঙ্গে রাখা হয়েছে।’

পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমীন লিজা বলেন, ‘হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এখনো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি, তবে ক্লিনিক্যালি সবাই হামে আক্রান্ত।’

তিনি জানান, হাম হলে অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়। এতে শিশুর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যেতে পারে। আক্রান্তদের আলাদা করে রাখা দরকার। কিন্তু রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে তা সম্ভব হচ্ছে না। আইসিসিইউ না থাকায় গুরুতর রোগীদের চিকিৎসাও কঠিন হয়ে যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, আতঙ্কিত হবেন না। জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। হামের লক্ষণ নিয়ে আসা প্রচুর রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। লক্ষণ দেখা দিলেই প্রথম কাজ হবে তাকে আলাদা করে ফেলা। বাসাতেও আলাদা রাখা যায়। বেশি সমস্যা মনে করলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সব হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে বিশেষায়িত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড আছে। সেখানে ভর্তি করে রাখবেন। আলাদা করতে হবে এজন্য যে এটা অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ।

তিনি বলেন, ‘এক বেডে চারজন কিংবা মেঝেতেও যদি আলাদা করে থাকা লাগে থাকুক। অসুবিধা নেই। শিশু তো মায়ের কোলেই থাকবে। কিন্তু হাসপাতালে থাকলে সেই শিশু তো চিকিৎসার মধ্যেই থাকবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। নদীর ওই পারের রাজবাড়ী, মাগুরা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদাহ, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা জেলার রোগী নদী পার হয়ে যখন এদিকে মানিকগঞ্জে ঢুকবে তাদের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমরা ব্যবস্থা করছি। মানিকগঞ্জ ক্রস করে ঢাকার এই ভিড়ে ঢোকার দরকার নেই। প্যানিক হওয়া যাবে না। প্যানিক হয়ে ঢাকামুখী হলে ঢাকার উপর চাপ পড়ে যাবে। রোগী যদি একমুখী হওয়া শুরু করে তখন মহাবিপদ হয়ে যাবে।’

 খুব অল্প সংখ্যক রোগীর আইসিইউ লাগতে পারে উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি করে রাখলে আইসিইউ লাগলে প্রয়োজন বুঝে চিকিৎসক তাকে আইসিইউতে নেবেন। মন্ত্রী মহোদয় দৌড়াদৌড়ি ছোটাছুটি করে কয়েকটি জায়গায় আইসিইউর ব্যবস্থা করেছেন। এ ছাড়া যেসব হাসপাতালে ভেন্টিলেটর মেশিন আছে, সেগুলো সব চালু করা হয়েছে। হামে আক্রান্ত রোগীদের কে আইসিইউ পেল, কে পেল না এটা বিবেচ্য বিষয় না। দুটি রোগীর হয়তো আইসিইউ সাপোর্ট লাগতে পারে। তা পরের বিষয়। অন্য ৯৮ জন রোগীকে আমরা ম্যানেজমেন্ট দিচ্ছি কি না, তাদের আইসোলেশনে রাখছি কি না, তাদের নিউট্রিশন, টেম্পারেচার এগুলো আমরা কন্ট্রোল করতে পারছি কি না এটা গুরুত্বপূর্ণ।’

হাসপাতাল থেকেই ছড়াচ্ছে হাম : রাজশাহী প্রতিনিধি আহসান হাবীব অপু জানিয়েছেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘেঁষাঘেঁষি করে রোগী ও তাদের স্বজনদের উপস্থিতির মাধ্যমে এই রোগের ভয়াবহভাবে বিস্তার ঘটাতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসনের তুলনায় সব সময়ই রোগী থাকে তিনগুণ। বিছানার দ্বিগুণ রোগী থাকেন মেঝেতে। আবার ওয়ার্ডের ভেতরে যেই সংখ্যক রোগী থাকে প্রায় সমান সংখ্যক রোগী থাকেন হাসপাতালের বারান্দায়। সবচেয়ে ঘিঞ্জি অবস্থা শিশু বিভাগে। একই বিছানায় রাখতে হচ্ছে তিন থেকে চারজন বা কখনো কখনো আরও বেশি রোগী। সরেজমিনে দেখা গেছে, ১০ এবং ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে পা ফেলার জায়গা নেই। মেঝেতে বিছানা পেতে রাখা হয়েছে শিশু। এতে অতিমাত্রায় সংক্রমণের ক্ষমতাসম্পন্ন হাম আরও বেশি ছড়ানোর শঙ্কা তৈরি করেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, হামের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে বিশেষায়িত ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সন্দেহভাজন রোগীদের সেখানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে, গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, এই ওয়ার্ডের ঘর ছাড়িয়ে রোগীর অবস্থান চলে গেছে বারান্দাতেও। এই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ৬ মাসের শিশুর মা মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার বাচ্চার ঠা-া লেগেছিল, নিউমোনিয়া হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম সাত দিন। এরপর বাড়ি গিয়ে দেখি হাম বেরিয়েছে। আবার হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। এখন হামের চিকিৎসা চলছে। সাজিয়া আখতার বলেন, আমার বাচ্চার হাম ছিল না। ওর নিউমোনিয়া হয়েছিল। হামের রোগীর পাশেই ছিল, সেখান থেকেই আক্রান্ত হয়েছে হামে। চিকিৎসকরা আলাদা রাখতে বললেও অনেকেই নিয়ম মানেনি। এতে আমার বাচ্চার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, কয়েক দিন আইসিইউতেও রাখতে হয়েছে। এখন কিছুটা সুস্থ আছে।

রামেকে উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশু মারা গেছে। মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। চট্টগ্রাম ব্যুরো মোহাম্মদ রফিক জানিয়েছেন, হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুর মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া শিশুর বয়স ছয় মাসের কম। তার বাড়ি কক্সবাজার বলে জানিয়েছে চমেক হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে। তবে হাম ছিল কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য সচিবের দুঃখ প্রকাশ : হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের সামনে ব্রিফিংয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। সেগুলোর ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি। হাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে এবং পত্রিকায় এসেছে। আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা প্রতিবেদনও পেয়েছি, উনারা বলেছেন যে সবাই কিন্তু হামে মারা যায়নি। অন্য জটিলতা নিয়েও তারা হাসপাতালে এসেছিলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমরা এটিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। সচিব বলেন, করোনা মহামারী চলাকালীন টিকাদান কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। সেই ঘাটতি পূরণে এবার বৃহৎ পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।

এ সময় স্বাস্থ্যের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকেএম মাসুদ-উল-ইসলাম, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ড. খন্দকার মো. ফয়সাল আলম, রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাহিদা ইয়াসমিনসহ হাসপাতালের অন্য কর্মকর্তা ও চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।

গাজীপুরে ২৭ শিশু ভর্তি : গাজীপুর প্রতিনিধি মো. আমিনুল ইসলাম জানান, হামে আক্রান্ত হয়ে গত তিন দিনে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৭ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তাদের হাসপাতালে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের অপুষ্টি থেকে দূরে রাখা এবং হামে আক্রান্তদের অন্যদের থেকে আলাদা রাখার বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে।

অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা : কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি সাগর আহম্মেদ জানান, কালিয়াকৈরে হামের প্রাদুর্ভাবে দুশ্চিন্তা বাড়ছে অভিভাবকদের। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাদিয়া তাসনিম মুনমুন জানান, হামের লক্ষণ নিয়ে তিন শিশু এলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ৯ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে জনসচেতনতা সভা : নাটোর প্রতিনিধি মো. আব্দুল হাকিম জানান, নাটোরে হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে জনসচেতনতা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন। তিনি বলেন, হামের উপসর্গ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সরকারি হাসপাতালে এজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আছে। হামের উপসর্গ নিয়ে কোনো শিক্ষার্থীকে স্কুলে না পাঠিয়ে বরং বাড়িতে বিশ্রাম নিতে হবে। কোনো অপপ্রচারে কান না দিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে আমাদের কাজ করতে হবে

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত